বিবাহ সম্পর্কিত গল্প

অম্লমধুর পেমের গল্প

( আমি পুরাতন কালের মানুষ, বয়সে যতটা না তারচেয়ে বেশি মনে। পুরানা সবকিছুই আমার ভালো লাগে, লেখালেখির ক্ষেত্রেও পুরাতন ধারাকে বেশি ভালো পাই। সাধু ভাষার প্রতি আমার আগ্রহ এবং অনুরাগের ইতিহাস অনেক দিনের। কিন্তু বানান জানি না, ব্যাকরণ জানি না, ভাষা আর গদ্যরীতির কথা আর নাই বা বলি। তবুও গাইতে গাইতেই যেমন গায়েন, তেমনি লিখতে লিখতেই হয়তো একদিন কিছু একটা হয়ে যাওয়া যাবে। তাই বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে সাধু ভাষায় আবারও একটা গল্প লেখার প্রচেষ্টা চালালাম, বেশি লম্বা হয়ে গেলে দুঃখিত। ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দিলে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবো। বিবাহ এবং পান সম্পর্কিত কিছু তথ্য আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটা প্রবন্ধ হতে সংগৃহিত)

বড় বাজারের বড় ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের একমাত্র সন্তান সুবীর সম্প্রতি প্রেমে পড়িয়াছে। যাহা তাহা প্রেম নহে, একেবারে ঘাড়মোড় ভাঙিয়া। এমন পড়াই পড়িয়াছে যে উহা হইতে উঠিয়া আসিবার কোন রাস্তা খুঁজিয়া পাইতেছেনা। তাহার প্রণয়ী পাশের বাড়ির শেফালী। ঘটনা স্বাভাবিক হইলে ভাবিবার তেমন কিছুই ছিলনা, সুবীরদের পরিবার অবস্থা সম্পন্ন, অত্র অঞ্চলের যে কোন অবিবাহিতা পাত্রীর মাতা-পিতার নিকট বিবাহের প্রস্তাব লহিয়া যাইবার দ্বার তাহাদের জন্য বরাবরই উন্মুক্ত। হুঁ, বিপত্তি ঐখানেই বাঁধিয়াছে, শেফালী বিবাহিতা, দাম্পত্য জীবনে যদিও সে সুখের লেশ মাত্র খুঁজিয়া পায় নাই। শেফালীদের পরিবারের সহিত তাহাদের রেষারেষির ইতিহাস অনেক পুরাতন, সেই প্রসঙ্গে পরবর্তীতে আসা যাইবে। বহু ব্যবহারে জীর্ণ হইলেও ইহা প্রমাণিত সত্য কথা যে প্রেম না মানে ধর্মের কথা, যুক্তির কথা। সুবীর বহু চেষ্টা করিয়াও শেফালীর প্রতি তাহার সুতীব্র প্রেমাভিলাষকে দাবাইয়া রাখিতে পারিতেছে না। আর শেফালীও ইদানীং ঠারে ঠোরে সুবীরের প্রতি তাহার আকর্ষণপ্রসূত প্রশ্রয়ের ইশারা রাখিয়া যাইতেছে। উগ্র প্রেমের লাভায় ভাসিয়া গিয়া সুবীর মর্মে মর্মে অনুভব করিতেছে যে শেফালীকে ছাড়া তাহার বাঁচিবার কোন উপায় নাই। কিন্তু এই বিষয়ে কাহারো সহিত বিস্তারিত আলাপ করিবার দুঃসাহসও তাহার হইতেছেনা।

কথায় বলে বিপদেই বন্ধুর পরিচয়। সুবীরের এই ঘোর ক্রান্তিকালে সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করিয়া দিল তাহার খুড়তুতো ভাই এবং বাল্যবন্ধু কুবের। সে সন্ধান জানাইলো এক তন্ত্রসাধক কাপালিকের যাহার দ্বারা অসম্ভব বলিয়া কিছু নাই, সাধুবাবা একই সাথে শাস্ত্রজ্ঞ এবং ইহ-পরজাগতিক সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান তাহার নখ দর্পণে। কুবের বলিতে গেলে বাবার দক্ষিণ হস্তের ন্যায়, নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত লোকদিগকে বাবার সুকীর্তির বর্ণনা দিয়া তাঁহার পানে ধাবিত করিতেছে। সে ইহাও পরিষ্কার করিয়া বুঝাইয়া দিল যে বাবা সচরাচর কোনো দিক নির্দেশনা প্রদান করেন না, তাঁহার উচ্চারিত শব্দগুলির মধ্য হইতেই ইশারা খুঁজিয়া নিতে হয়। তবে বিষয়ের গুরুত্ব অত্যাধিক হইলে মন্ত্রপুতঃ সমাধান প্রদান করিয়া থাকেন। অবশ্যই উপযুক্ত সম্মানীর বিনিময়ে। ধনীর একমাত্র সন্তান সুবীরের নিকট অর্থকড়ি কোনো সমস্যাই নহে, শেফালীর ভালোবাসাই তাহার পরম আরাধ্য, যে কোন মূল্যে।

প্রবল প্রেমাক্রান্ত সুবীর একদা প্রত্যূষে সাধু বাবার সন্ধানে গৃহত্যাগ করিল। দ্রুত হাঁটিয়া বেলা দ্বিপ্রহরেই তাঁহার ডেরায় পৌছাইয়া গেল। ডেরা বলিতে বিশাল এক বটবৃক্ষের নিম্নে সাময়িক আটপৌরে আস্তানা । সাধু বাবা যাযাবর প্রকৃতির মানুষ। এক অঞ্চলে বেশিদিন অবস্থান করিবার অভ্যাস নাই। মাসতিনেক হইলো অত্র অঞ্চলে ঠাঁই গাঁড়িয়াছেন, কিন্তু ইতিমধ্যেই তাহার বিস্তর ভক্ত জুটিয়া গিয়াছে। এই বেলায় অবশ্য আস্তানার চারপাশে কাহাকেও ভিড় করিতে দেখা গেলনা—সুবীর বাবাকে একাকী পাইয়া মনে মনে আনন্দিত বোধ করিতে লাগিল।

বাবা ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, সুবীর নিকটবর্তী হইতেই চোখ বন্ধ রাখিয়াই পদযুগল প্রসারিত করিয়া দিলেন। সে নতজানু হইয়া পদধূলি গ্রহণ করিল। সাধুবাবা তাহাকে ইশারায় বসিতে বলিয়া আবার ভাবের জগতে ডুবিয়া গেলেন। সাধু বাবার পরিধাণে গেরুয়া, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে রক্তবর্ণ তিলক, হস্তে আনন্দবাজার পত্রিকার একখানা পুরাতন সংখ্যা। সুবীর মনে মনে কথা সাজাইতেছিল, বাবার নিকট তাহার হৃদয়ের আকুলতা প্রকাশ করিয়া তাহার বর্তমান হুলস্থূল পরিস্থিতির একটা মধুরণ সমাপয়েত নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে তাহার শান্তি মিলিবেনা। কিন্তু বাবা তাহাকে চমকাইয়া দিয়া চক্ষুমুদিত অবস্থাতেই গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ‘মনুর বিধান অনুসারে বিবাহ আট প্রকারঃ ব্রাহ্ম্, দৈব, আর্য, প্রাজাপাত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস এবং পৈশাচ। সামাজিক দৃষ্টিতে তাহার মধ্যে সর্বোত্তম যদি হয় গান্ধর্ব তবে অতি নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য রাক্ষস ও পৈশাচ বিবাহ। রাক্ষস বিবাহে কন্যাপক্ষীয়দের হত্যা করিয়া বলপূর্বক কন্যাকে বিবাহ করা হয় আর পৈশাচ বিবাহে নিদ্রিত অবস্থায় অথবা মদ্যপানে বিকলচিত্ত বা উন্মত্ত কন্যাকে অপহরণ করিয়া নির্জন স্থানে লইয়া গিয়া বিবাহ করা হয়।’

বিনা মেঘে হঠাৎ করিয়া এমন গুরুতর আলোচনার অবতারণায় সুবীর হতবিহবল হইয়া পড়িল। বুঝিতে পারিল, বাবা অন্তর্যামী , সে মুখ খুলিবার আগেই তাহার আসিবার কার্যকারণ সম্পর্কে সম্যক অবগত হইয়া বসিয়া আছেন। যদিও রাক্ষস বা পৈশাচ বিবাহের কোনটাই তাহার মনে ধরিল না, কিন্তু সামাজিক রীতিনীতি অনুসারে তাহাদের মধ্যে অন্য কোন প্রকারের বিবাহের উপায়ই আর অবশিষ্ট যে নাই তাহা সে ভালো করিয়াই জানে। দুরু দুরু বক্ষে সে একটা প্রশ্ন করিতে যাইবে এমতাবস্থায় বাবা নাসিকা গর্জনের সহিত গভীর ঘুমে তলাইয়া গেলেন। প্রবীর আর মুখ খুলিতে সাহস পাইলনা, ভ্যাবলাকান্তের ন্যায় ফ্যালফ্যালাইয়া শূন্য দৃষ্টিতে মহাজ্ঞানী মহাজনের জাগিবার অপেক্ষা করিতে লাগিল।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইলোনা, বাবা চক্ষু উন্মোচন করিয়া পত্রিকার পাতায় চোখ রাখিয়া পুনরায় বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন, ‘ নায়ক কতৃক নায়িকা অপহরণ এবং পরস্পরের হাত ধরিয়া দুইজনের পলায়ন সভ্যতার আদি পর্ব হইতেই চলিতেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের প্রাণরসই বোধকরি যুবক-যুবতীর প্রণয় এবং নানা বিপত্তির মধ্য দিয়া তাহাদের মিলন অথবা বিয়োগান্ত পরিণতি। যদিও প্রণয়ীকে লইয়া প্রণয়প্রার্থীর পলায়ন প্রায়শ চাঞ্চল্যকর নাটকীয়তা সৃষ্টি করিয়া থাকে, কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ইহা ছাড়া প্রেমাভিলাষ পূর্ণ করিবার আর কোন উপায়ও অবশিষ্ট থাকেনা।’

গুরুদেব পুনরায় দৃষ্টির ঝাপ অবনত করিলেন। সুবীরের প্রেমার্ত হৃদয়ে অবশ্য ইতিমধ্যেই এই ধারণা বাসা বাঁধিতে শুরু করিয়াছে যে ভাগিয়া যাওয়া ছাড়া তাহাদের সম্মুখে মিলনের আর কোন রাস্তা খোলা নাই। কিন্তু শেফালীকে কী করিয়া উহাতে রাজী করিবে, সে নিজে তাহার জন্য জীবন পর্যন্ত বিলীন করিতে প্রস্তুত থাকিলেও, শেফালী কি তাহার প্রতি ততোটা অনুরাগী? সে কি তাহার স্বামী-সন্তান-সংসার সব পরিত্যাগ করিয়া এক বস্ত্রে পথে নামিতে উৎসাহী হইবে? যদি বাস্তববাদী চিন্তায় প্রভাবিত হইয়া শেফালী ভাগিয়া যাইবার পরিকল্পনাকে খারিজ করিয়া দেয় তাহা হইলে তাহার মনের চাবি ভাঙিয়া তাহাকে দুঃসাহসী রোমাঞ্চভিলাষীতে পরিণত করিবার আর কোন কার্যকর পন্থা কি রহিয়াছে?

আবারও দৈববাণীর ন্যায় সাধক মহাশয়ের মুখ খুলিয়া ধ্বনিত হইল,-‘ সংস্কৃত পর্ণ। বাংলায় পান। মন্ত্রপুতঃ তাম্বুল।’

‘ঞ্যাঃ’—বিস্মিত সুবীর আর কোন শব্দ খুঁজিয়া পাইলোনা।

সুবীরের মনে পড়িয়া যায় তাম্বুল রাগে রঞ্জিত শেফালীর পানপানা মুখখানি। গত বৎসরে এক অনুষ্ঠানে তাম্বুল অধরে শেফালীর ঘুমে ঢুলুঢুলু আঁখি দেখিয়াই না তাহার হৃদয় উড়িয়া যায়। গুরুদেব কোথা হইতে একখানা দোতারা বাহির করিয়া গুনগুনাইয়া একটা বৈষ্ণব গান গাহিতে আরম্ভ করিলেন। সুবীর মনোযোগ আর ধৈর্য্যের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা খাটাইয়া গানের কথার চুম্বক অংশমাত্র অনুধাবন করিতে সমর্থ হইলোঃ-‘ হাথক দর্পণ, মাথক ফুল/ নয়নক অঞ্জন, মুখক তাম্বুল।’

এক পর্যায়ে সে নিজের অজান্তেই সাধক বাবাজির সহিত কন্ঠ মিলাইতে শুরু করিল। সুরের মূর্ছ্বনায় তাহার চক্ষু মুদিয়া আসিল, অন্তর বিগলিত হইয়া গেল। বাবা সম্মুখে আগাইয়া আসিয়া বিনা আভাষে তাহার মুখে একখানা মন্ত্রঃপুত তাম্বুল গুঁজিয়া দিলেন। সুবীর চমকাইয়া উঠিয়া নেত্র উন্মোচন করিল, বাবা তাহার চক্ষুর পানে সম্মোহনী দৃষ্টি ঢালিয়া খানিকটা উচ্চস্বরে গাহিতে লাগিলেন, ‘ অধরের তাম্বুল বয়ানে লাগিয়াছে/ ঘুমে ঢুলুঢুলু তব আঁখি।’

তাম্বুলের রস আস্বাদন করিবা মাত্র তাহার মাথা ঝিমঝিম করিয়া উঠিল, সমস্ত দুশ্চিন্তা কর্পূরের ন্যায় উবিয়া গিয়া সুবীরের হৃদয় নির্ভেজাল প্রশান্তিতে মৌ মৌ করিয়া উঠিল। এতটা নিরাপদ সে বহুকাল বোধ করে নাই, বুঝিতে পারিল যে বাবা মন্ত্রপুতঃ তাম্বুলের মাধ্যমেই তাহার সমস্যার সমাধান করিবেন।

মাথার ঝিমঝিম কমিয়া আসিলে সুবীর বাবার সহিত সম্পূর্ণ বিষয়টি লহিয়া বিস্তারিত আলোচনায় মগ্ন হয়। বাবার দাবী শুনিয়া শুরুতে কিছুটা দমিয়া গেলেও প্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হইয়া সে মনস্থির করিয়া ফেলিল। মাত্র দুই খিলি মন্ত্রপুতঃ তাম্বুলের জন্য সাধু বাবা পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবী করিয়াছেন, এই মর্মে যে, ইহাতে কেবল মাত্র শেফালীর গৃহত্যাগই নহে, পরবর্তীতে তাহাদের দুইজনার নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বীকৃতিও নিশ্চিত হইবে। সুবীরের মস্তকে এই মুহূর্তে শেফালী ব্যতীত পার্থিব আর কোনো কিছুর গুরুত্ব নাই, সে কয়েক পল ভাবিয়াই সাধু বাবার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিল। তবে সিদ্ধান্ত হইলো যে কার্যসিদ্ধির পূর্বে কোনো অর্থব্যয়ের প্রয়োজন পড়িবে না, অদ্য সুবীর একখিলি পান লহিয়া শেফালীর নিকট যাইবে এবং আগামীকাল তাহাকে সঙ্গে করিয়া দুই ক্রোশ দূরের পুরাতন মন্দিরের নিকট বাবার সহিত মিলিত হইবে। ঐখানে বাবা অর্থ গ্রহণ পূর্বক আরেক খিলি পান প্রদান করিবেন। শেফালী অদ্য পান গ্রহণ করিলেই বুঝিতে হইবে যে মন্ত্রের কাজ শুরু হইয়া গিয়াছে, সুবীরের উচিত হইবে অনতিবিলম্বে অর্থ-কড়ির সংস্থান করিয়া ফেলা।

বাবার ডেরা হইতে বাহির হইয়া সুবীর আরও দ্রুতপদে চলিতে লাগিল, তাহার বুক পকেট হইতে মন্ত্রপড়া পান যেন বারংবার ঘাঁই মারিতেছে। বাবা খুব যত্ন করিয়া, দুর্বোধ্য সব মন্ত্র পাঠ করিয়া উহাকে নিজ হস্তে প্রস্তুত করিয়াছেন। পানটি দেখিতে অনেকাংশে ডিঙ্গি নৌকার মতো। সুবীরের স্মৃতির তরঙ্গে বাতাস লাগিয়া কী যেন মনে পড়িয়া যায় যায় করিয়াও পড়ে না। স্মৃতির সহিত পাঞ্জা না লড়িয়া সে সুখ-কল্পনার সাগরে ভেলা ভাসাইয়া দেয়। আহা আর মাত্র একটি দিন বাকী, তাহার পরেই শেফালী তাহার হইবে, সুবীরের তনু-মনে অজানা সব শিহরণের হিল্লোল বহিয়া যায়।

শেফালী কলসী লহিয়া পুকুর ঘাট হইতে বাড়ির দিকে যাইতেছিল, সুবীরকে দেখিয়া দাঁড়াইয়া যায়। সুবীর সাধু বাবার পরামর্শ অনুযায়ী কোনো সম্ভাষণ বা আলাপচারিতা ব্যতিরেকেই বুক পকেট হইতে মন্ত্রপুতঃ তাম্বুল বাহির করিয়া শেফালীর দিকে বাড়াইয়া দেয়। ডিঙ্গি নৌকা আকৃতির পান দেখিয়াই শেফালীর চেহারা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে, এতটাই চমকাইয়া যায় যে তাহার হস্ত হইতে জলভর্তি মাটির কলস পড়িয়া গিয়া ভাঙিয়া খান খান হইয়া যায়। শেফালীর প্রশ্নবোধক দৃষ্টির দিকে চাহিয়া সুবীর ধরাকন্ঠে বলিয়া ওঠে, ‘ রাত পোহাবার পূর্বেই, শ্যাওড়া গাছের তলায়।’ শেফালী অতি কষ্টে সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়াই দ্রুতপদে বাড়ির ভেতরে ছুটিয়া যায়।

সুবীর সমস্ত রজনীতে এক মুহূর্তের পানেও দুই চক্ষু একত্র করিতে পারে নাই। রাত্রি দ্বিপ্রহরের পর হইতেই শ্যাওড়া গাছে নিচে অস্থির পায়ে পায়চারি করিতেছে। তাহার স্কন্ধে একটিমাত্র ঝোলা, উহার মধ্যে লক্ষাধিক টাকা। বাবাকে তাহার সম্মানী বুঝাইয়া দেওয়ার পরে বাকি অর্থ সে তাহার আর শেফালীর সুখী সংসারের জন্য ব্যয় করিবে। তাহার বিন্দুমাত্রও লজ্জা বোধ হইতেছে না ইহা মনে করিয়া যে, সমস্ত অর্থই সে তাহার পিতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সিঁদ কাটিয়া জোগাড় করিয়াছে। প্রেম আর যুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নাই, উহাতে বিজয়ী হওয়াই একমাত্র লক্ষ্য। ইহা ছাড়া আর কোনো পন্থাও অবশিষ্ট ছিল না, সুবীরের বাবা প্রবীর খুবই জাঁদরেল মানুষ, জাত-পাত কঠিনভাবে মানিয়া চলেন। সুবীরের হঠাৎ করিয়া মনে পড়িয়া যায়, এই শেফালীর প্রেমে পড়িয়া হাবুডুবু খাইয়াছিল তাহার খুড়তুতো দাদা রণবীর, শেফালীও তাহাকে প্রাণ উজাড় করিয়া ভালোবাসিয়াছিল। উহা জানিতে পারিয়া প্রবীর তাহাকে বাড়ির উঠানে সকলের সম্মুখেই জুতাপেটা করিয়াছিলেন, শালিস ডাকিয়া শেফালীর বাবাকে চরমভাবে অপমানিত করিয়া গ্রামছাড়া করিবার দাবী জানাইয়াছিলেন। সেই অপমান সহিতে না পারিয়া রণবীর নিরুদ্দেশ হইয়া যায় আজ হইতে প্রায় এক যুগ আগে। আর শেফালীর বাবা তড়িঘড়ি করিয়া কন্যার সম্বন্ধ স্থির করিয়া ভূলুন্ঠির মান-সম্মান খানিকটা হইলেও পুনোরুদ্ধার করেন।

রাত্রি ভোর হইবার কিয়ৎকাল পূর্বে কুয়াশা ভেদিয়া শেফালীর ভীরু অবয়ব ফুটিয়া ওঠে। সুবীরের অন্তরাত্মা আনন্দে লাফাইয়া উঠিয়া তাহার কন্ঠরোধ হইবার উপক্রম হয়। শেফালী এক বস্ত্রেই গৃহত্যাগ করিয়াছে। সুবীরের হাত ধরিয়া সে বিনাদ্বিধায় পথে নামিল, মন্ত্রপুতঃ তাম্বুলের কার্যকারিতা দেখিয়া সাধু বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় সুবীরের অন্তর বিগলিত হয়। অতীব চমকপ্রদ আনন্দানুভূতিতে আচ্ছন্ন হইয়া সে পথ চলিতে চলিতে গুনগুনাইয়া গাহিতে আরম্ভ করে-‘এই পথ যদি আর শেষ না হয়…’। যদিও অতি দ্রুত গ্রামের সীমানা পাড়ি দিয়া বাবার সহিত মিলিত হইতে তাহার তর সহিতেছিল না। শেফালী একটি বারের জন্যও তাহার মুখপানে দৃষ্টিপাত করিয়া উঠিতে পারে নাই। ভীরু পায়ে, লজ্জাবনত মস্তকে, কী এক অদ্ভুত মায়ার বাঁধনে জড়াজড়ি করিয়া তাহারা দু’টিতে সেই পুরাতন মন্দিরের দিকে আগাইতে থাকে।

দূর হইতেই তাহাদের দেখিয়া সাধুবাবা নিজেই আগাইয়া আসিলেন। তাহার মুখভঙ্গিতে সেই শান্ত-সমাহিত রূপটি আর অবশিষ্ট নাই, খানিকটা উত্তেজিত বলিয়া বোধ হইতেছে। বাবা তাহাদের সঙ্গে লহিয়া মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। বেদীর সম্মুখে একখানি খর্জুরপত্রের পাটি বিছানো রহিয়াছে। শেফালী অল্পবিস্তর কাঁপিতে আরম্ভ করিল, তাহার চক্ষু নিজের অজান্তেই অশ্রুতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। সাধু বাবা কাহারও সহিত কোনোরূপ বাক্যবিনিময় না করিয়া উভয়কেই তাহার সম্মুখে বসিতে বলিলেন। সুবীর তাহার ঝোলা হইতে টাকা বাহির করিতে গেলে বাবা ইশারায় তাহাকে নিরস্ত করিলেন। তাম্রনির্মিত তাম্বুল সম্পূট হইতে বাহির করিলেন দুই খিলি পান। একখানা শেফালির হস্তে দিয়া আরেকখানা সুবীরের মুখে পুরিয়া দিলেন। সুবীরের জিহবা জ্বালা করিয়া উঠিল, মনে হইলো সমস্ত দুনিয়া খনিজ একত্রিত হইয়া তাহার মুখে আক্রমণ করিয়াছে। ঢোঁক গিলিতেই মুহূর্তে তাহার দৃষ্টি ঘোলাটে হইয়া উঠিল, মাথা ঘুরিয়া পরিয়া যাইবার পূর্বক্ষণে সুবীর দেখিতে পাইলো সাধুবাবা একহাতে তাহার টাকাভর্তি ঝোলা আর আরেক হাতে প্রেয়সী শেফালীকে লহিয়া মন্দির হইতে বাহির হইয়া যাইতেছেন।

জ্ঞান হারাইবার পূর্বে জটার আড়ালে ঢাকা পড়া সাধুবাবার আসল পরিচয় চিনিতে পারিয়া সুবীর চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিতে চাহিল, ‘ রণবীরদা, আমাকে ফেল যেওনা, বাবাকে বলে দেব, মাইরি বলচি।’

কিন্তু তাহার কণ্ঠ হইতে মৃত্যুপথযাত্রী পশুর ন্যায় ঘড়ঘড় শব্দ ব্যতিরেকে আর কিছুই বাহির হইলো না।

রণবীরের হাত ধরিয়া শেফালীর ছায়া দেখিতে দেখিতে মিলাইয়া গেল।

 

তালাক সম্পর্কিত একটি গল্প

এক লোক তার বউকে তিন তালাক দিয়ে দিলো, অবশেষে তার ভুল বুঝে তাকে ঘরে নিতে চাইলো। (ইসলাম ধর্মের রীতি অনুসারে,তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিলেই কেবল প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী হালাল হবে আবার বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে।) মহিলাকে একজন ভালো মানুষের সাথে তালাকের শর্ত দিয়ে বিয়ে দিলো।এক দিন যায়,দুই দিন যায়,সপ্তাহ যায় এমনকি মাস যায়, দ্বিতীয় স্বামী মহিলাকে তালাক দেয়না।প্রথম স্বামী গিয়ে দ্বিতীয় স্বামীকে ধরণা দেয় কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী মহিলাকে তালাক দেয় না।এলাকার লোক জন ধরলো দ্বিতীয় স্বামীকে, আপনার সাথে যুক্তি করে নিয়েছিলাম বিয়ে করে তালাক দিয়ে দিবেন অথচ এক মাস হয়ে গেলো কিন্তু তালাক দেওয়ার কোন নমুনা তো দেখিনা।

দ্বিতীয় স্বামী বলছে আমি বিয়ে করেছি কি তালাক দেওয়ার জন? বিয়ে কি সমুদ্রের পাড়ে বালুর ঘর বানানোর মতো?যে ঢেউ এসে ভেঙ্গে যাবে। আর তালাক হচ্ছে দুনিয়ার মধ্যে নিকৃষ্টতম হালাল। হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে আমি কি জবাব দিবো? অতঃপর কেউ আর তাকে কিছু বলার মতো কারণ খুঁজে পেলনা।

মোরালঃ ভাবিয়া করিও কাজ,করিয়া ভাবিও না।

বধূ মিছে রাগ কোরো না

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে মান-অভিমান হবেই, আবার মান ভাঙাতেও হবে। ছোট ছোট সমস্যা যেন বড় আকার ধারণ না করে।আটটার দিকে বাড়ি ফিরেই ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন স্বামী। একের পর এক ফোন সেরে ল্যাপটপ নিয়ে বসা। ওদিকে মুখ থমথমে স্ত্রীর। সারা দিন পর দেখা, একটু হাসিমুখে কথাও বলা হলো না। এতই ব্যস্ততা!ছুটির দিন দুপুরে বসার ঘরে জেঁকে বসে আছে স্বামীর বন্ধুরা। স্বামীকে বারবার ইশারা করেও লাভ হচ্ছে না। ওঠার নাম নেই। একটা ছুটির দুপুর মাটি হয়ে যাবে তাহলে! ব্যস, স্ত্রীর মুখ অন্ধকার।

কিংবা মায়ের পরামর্শ ছাড়া স্ত্রী যেন চলতেই পারছেন না, তাই বলে দুজনের সব কথাই গিয়ে বলতে হবে মাকে? স্বামীর মনে অভিমানের ছায়া।খরচ বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছেন দুজনই, তাই বলে একটা দিনও কি একটু ভালো রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া যাবে না। এই নিয়ে মতান্তর, শেষমেশ দুজনের কথা বন্ধ।

ছোট ঘটনা, বড় অভিমান। তুচ্ছ কথা-কাটাকাটি থেকে বড় ঝগড়া। কয়েক মিনিটের ঝগড়াতেই আপন এ মানুষকে মনে হতে পারে খুব দূরের কেউ। আর এসবের জের অনেক দূর পর্যন্তও গড়ায়। হয়তো মনে হতে পারে, একটু ঝগড়া হয়েছে এ আর এমন কী। কিন্তু সময়মতো মিটিয়ে না ফেলে তা জিইয়ে রাখা মোটেও উচিত নয়। হয়তো আবার কথা বলা শুরু হলো দুজনের। কিন্তু মনের কোণে একটু ক্ষোভ রয়েই গেল। এভাবেই মেঘের ওপর মেঘ জমে দুজনের জীবনে ফেলতে পারে কালো ছায়া।

‘যত বড় ঝগড়া-ই হোক। সঙ্গী কিন্তু আপনার জীবনের একটা বড় অবলম্বন। একটু অভিমান হয়েছে। তিনি ই কিন্তু আবার আপনার সমর্থনে সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত।’ বলেন মনোয়ারা চৌধুরী। শিক্ষকতা পেশায় আছেন তিনি। আর তাঁর স্বামী এস আর চৌধুরী কাজ করছেন গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের মেডিকেল অ্যাডভাইজার হিসেবে। ৪৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে অভিমান, ঝগড়া হয়েছে অনেকবার। কিন্তু কোনোবারই তা মিটে যেতে বেশি সময় লাগেনি বলে জানালেন।ঝগড়া হয়েছে, কথা বন্ধ। এটা যেন দাম্পত্যের অলিখিত নিয়ম।রাগ হলে কে আগে মান ভাঙাতে আসে? সানজিদা আহমেদের (ছদ্মনাম) উত্তর—‘অবশ্যই আমি।

কথা বলা বন্ধ করে আবার নিজেই শুরু করে দিই। আমার এসব মান-অভিমানের পালা সাধারণত ঘটে রাতে ঘুমানোর আগে। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতেই আবার শেষ।’আর স্ত্রী রাগ করলে হেঁড়ে গলায় গান ধরাটাকে বেশ ভালো উপায় বলেই মানেন আহসান হাবীব (ছদ্মনাম)। আর এ ক্ষেত্রে ‘তোমার জন্য মরতে পারি ও সুন্দরী…’ এমন লাইনগুলোই নাকি ভালো। ‘গান ধরলে ও প্রথমে একটু রাগ রাগ ভাব করে। তার পরই হেসে ফেলে। ব্যস ঝগড়া শেষ। আমি বলি, আর কোনো দিন এমন হবে না। ও বলে, তুমি তো বারবারই এমন বলো, তার পরও একই কাজ করো। আমি আর কী বলব, বলি, আমি তো এমনই।’ বললেন তিনি।কে আগে মান ভাঙাবে? এগিয়ে আসা একটু কঠিনই বটে। মনোয়ারা চৌধুরী মনে করেন, এ ক্ষেত্রে ছেলেদের এগিয়ে আসাই ভালো। ‘মেয়েরা এমনিতেই একটু বেশি অভিমানী হয়। আবার অল্পতেই খুশি হয়ে যায়। ঝগড়ার মুহূর্তটা জিইয়ে না রেখে স্বামী যদি একটু নরম হন, তাহলেই তো হলো।’

দুজনের ঝগড়ায় ভালো কোনো বন্ধু, কাছের আত্মীয়রাও মিটমাটের উদ্যোগ নিতে পারেন। আর সন্তানেরা তো বড় একটা ভূমিকা রাখেই। নিজে হয়তো স্যরি বলতে পারছেন না। সন্তানকেই বলতে পারেন মান ভাঙানোর ব্যবস্থা নিতে। তারা হয়তো সবাইকে নিয়ে আয়োজন করে ফেলতে পারে চমৎকার একটা পার্টি আবার পছন্দের কোনো কিনে আপনার তরফ থেকে উপহার দিতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মেখলা সরকার জানান, একজন রেগে গেলে অবশ্যই অন্যজনকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। আর যে কারণেই মতান্তর হোক, তা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করে মতের অমিলটা দূর করতে হবে। তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই নয়, বরং পরে দুজনই যখন শান্ত হবেন, তখন আলোচনা করা উচিত। এ নিয়ে কথা না বললে তা চাপা ক্ষোভ হিসেবে জমা হতে পারে, যা পরে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে।তবে নিজেদের ঝগড়ার কথা কাকে বলব আর কাকে বলব না সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। অনেকেই আবার এর সুযোগ নিতে পারে।

যা নিয়েই মতান্তর হোক আদতে তো সেটা মান-অভিমানের দিকেই গড়ায়। আর তা যেন সেখানেই শেষ হয়ে যায়। এর বেশি যাতে না যেতে পারে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই।

 

ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বিরত থাকে পুরুষ

বিবাহিত নারীর সঙ্গে অনুচিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা পুরুষের জীবনে বিরল নয়। তাঁরা প্রতিবেশী বা অন্য কারও স্ত্রীর প্রতি ঘটনাচক্রে দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে এ ধরনের সম্পর্ক তৈরি থেকে পুরুষেরা সাধারণত বিরত থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে অবস্থিত মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএমএসএল) একদল গবেষকের দাবি, সম্ভবত মানসিক গঠনের কারণেই তাঁরা বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততা বজায় রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকেন।

ইউএমএসএল কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মার্ক ফিনের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের পরিমাণের তারতম্য নিয়ে গবেষণা করেন। মানসিক অবস্থাভেদে পুরুষের শরীরে এই হরমোন নিঃসরণে তারতম্য হয়। হিউম্যান নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য প্রেমিকা বা শত্রুর স্ত্রীর সান্নিধ্যে অবস্থানকালে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে অবস্থানকালে টেস্টোস্টেরন নিঃসরণের পরিমাণ তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। এমনকি সুযোগ পেলেও বন্ধু এবং বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখার স্বার্থে অনুচিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে পুরুষ নিজেকে সংযত রাখেন। গোটা ব্যাপারটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

গবেষকদের দাবি, মানুষের প্রকৃতিগত এই বিশ্বস্ত মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য জাতিসংঘ বা ন্যাটোর মতো সংগঠনও মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে।
সূত্রঃ প্রথম আলো (ঢাকা, সোমবার,২৫ মার্চ ২০১৩,)

 

বিয়ের আগে বিয়ের পরে

‘বিয়ের আগে অসম্পূর্ণ ছিলাম, বিয়ের পর একদম বরবাদ হয়ে গেছি।’ কমেডিয়ান হেনরি ইয়াংম্যানের স্রেফ রসিকতা এটি। শুনে তো হাসবেনই, তবে একবার হয়তো নিজের বিয়ের পর প্রথম দিনকার কথাগুলোও মনে পড়ে যাবে।

সারা রাত পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজ করে ভোরের আলো ফোটার পর ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস যে মেয়েটির, তাঁকে হয়তো বিয়ের পর ১১টা বাজতেই ঘুমানোর আয়োজন করতে হয়। মশারি খাটালেই দম বন্ধ হয়ে যেত যাঁর, তাঁর স্বামীর হয়তো একটি মশার গুনগুন কানে গেলেই ঘুম হারাম হয়ে যায়। পরিপাটি খাবার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ায় অভ্যস্ত মেয়েটির, শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা হয়তো টেলিভিশনের সামনে বসেই কোনোমতে খেয়ে নেন।

ঝাল খাওয়ার একদমই অভ্যাস ছিল না মেয়েটির। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে সবাই খুব ঝাল খান। এক বছর চেষ্টা করেও মানিয়ে নিতে পারেননি মেয়েটি এই খাদ্যাভ্যাসে। এখন বাধ্য হয়েই নিজের জন্য আলাদা রাঁধার ব্যবস্থা করে নিতে হয়েছে। তাতে শাশুড়ি একটু ক্ষুণ্ন হয়েছেন, কিন্তু খাওয়াদাওয়ার কষ্ট থেকে তো মুক্তি পেয়েছেন তিনি। এ নিয়ে রোজকার খিটিমিটিও আর হয় না এখন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এমনই জানিয়েছে তিনি।

বিয়ের আগের জীবন আর বিয়ের পর—দুটোয় আকাশ-পাতাল তফাৎ, এমন বলেন অনেকেই। তবে সেই নতুন জীবনেও তো মানিয়ে নিতে হবে। আর সেজন্য চাই ধৈর্য আর ইচ্ছাশক্তি।

মনিকা’স বাঁধন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মনিকা পারভীন দীর্ঘদিন ধরে দম্পতিদের পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, প্রেম করে বিয়ে করা জুটিদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া আগেই তৈরি হয়ে যায়। একটু সতর্ক থাকতে হবে সম্বন্ধ করে বিয়ে হলে বা বিয়ের পর যৌথ পরিবারে থাকতে হলে। নতুন জীবনে সমস্যা হলে সেটা লুকিয়ে রেখে লাভ নেই। বরং বলে ফেলাতেই দুজনের বোঝাপড়া তৈরি হওয়া সম্ভব। তবে এখানেও খুব সাবধান। ‘বলার ধরন আর বলার সময় দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা কিছু হলেই অনুযোগ না করে বরং পরে অন্তরঙ্গ সময়েও ভালোভাবে সেটি বুঝিয়ে বলা যায়। হাসিঠাট্টার মধ্যে বলা গেলে তো আরও ভালো।’ বলেন মনিকা পারভীন।

বাথরুম ভেজা থাকাটা হয়তো দারুণ বিরক্তিকর আপনার কাছে। অথচ স্বামী বাথরুমে যাওয়া মানেই পুরো বাথরুম ভিজে একাকার হওয়া। এমনকি কোনো দিন হয় যে সেই ভেজা বাথরুমে পা পিছলে গেল তাঁরই। তখন ঠাট্টা করে বলতে পারেন, ‘দেখলে তো তুমিই ভুগলে’। এভাবে বললে তিনি নিশ্চয়ই আরও সতর্ক হবেন। তিনি বাথরুম থেকে বের হওয়া মাত্রই চেঁচামেচি করাটা কোনো সমাধান নয়। আর এটাও মেনে নিতে হবে দশটা সমস্যার মধ্যে হয়তো সাতটির সমাধান হবে। বাকি তিনটি মানিয়ে নিতে হবে।

যৌথ পরিবার হলে শুরু থেকেই পরিবারের সবার সঙ্গে মিশতে হবে। অনেকেই ভাবেন, বিয়ের পর একটু চুপচাপ থাকি। কিছুদিন পর থেকে সংসারের কাজ করব, সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বাড়াব। এই মনোভাবও ঠিক নয় বলে মনে করেন মনিকা।

বাপের বাড়ির সুবিধাগুলো একটি মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে পাবেন না, তা কিন্তু নয়। তবে শুরুতেই নিজের সমস্যা বা অভ্যস্ততার ব্যাপারগুলো বলা ঠিক না। আর বলতে হলেও স্বামীকেই প্রথম বলা উচিত। তিনিই অন্যদের বুঝিয়ে বলবেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা বানাতে হবে, ঠিক তা হয়তো এখনকার শাশুড়িরা আশা করেন না। কিন্তু উঠে একটু রান্নাঘরে যাওয়া, পরিবেশন করা, এটুকু করলে তিনি খুশি হন। এভাবে সম্পর্কটা সহজ হয়ে এলে একসময় তিনিই খেয়াল করবেন আপনার অসুবিধাগুলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই সমস্যার কথা না বলে একটু সময় নিন। ভেবেচিন্তে পরে এ নিয়ে আলোচনা করুন।

Likes(0)Dislikes(0)

Click Here to get update news always
প্রতি মুহুর্তের আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করন
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন