ইসলামিক জীবন

ইসলাম ও সুশৃঙ্খল জীবন

ইসলামিক জীবন ব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে ধারণ করলে মানবজীবনে শান্তির ধারা প্রসারিত হবে। ইহলোকে সাধিত হবে কল্যাণ আর পরকালে রয়েছে উত্তম প্রতিদান। ইসলাম রান্নাঘর থেকে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি পর্যন্ত সর্ব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেয়।
ইসলাম অনুসারে আদব-কায়দা ও এক মুসলমান অপর মুসলমানের প্রতি আচরণ এবং কল্যাণ কামনার রীতি-নীতিঃ
আদাব শব্দের অর্থ
আলআদাবু শব্দটি আদাবু এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ শিষ্টাচারিতা, ভদ্র ব্যবহার, উন্নত আচরণ। আবার এর আরেকটি অর্থ হলো রীতি-নীতি, যেমন বলা হয় পাঠের রীতি নীতি বা বিচারকের রীতি নীতি। আদাব শব্দটি বাবে কারিমু ইয়াকরিমু এর মাসদার হতে পারে। তখন এর অর্থ হবে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়া ও শিষ্টাচারপূর্ণ হওয়া। আদাবের ভাষাগত কয়েকটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়। যেমন মিরকাত প্রণেতা বলেন “প্রশংসনীয় কথা ও কাজকে আদাব বলা হয়।” ইমাম সুয়ুতী (রঃ) বলেন- “উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করাকেই আদাব বলে।”
কেউ কেউ বলেন-ভাল কাজের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার নাম আদাব আবার
কারো মতে- বড়দের সন্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করাকে আদাব বলে। আদাব হচ্ছে আরবী ভাষার একটি শব্দ যার বাংলা হিসেবে আমরা আদব বলে থাকি।

সালাম শব্দটির আভিধানিক অর্থ নিম্নরূপঃ
১.দোষ ক্রটি হতে মুক্ত থাকা।
২.শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা।
৩.স্বাগতম ও অভিবাদন জানানো।
৪.আনুগত্য প্রকাশ করা।
আল্লামা রাগেব ইস্পাহানী (র) বলেন, সালাম শব্দটি আল্লাহর একটি নাম। কেননা আল্লাহ যাবতীয় দোষ ত্রুটি হতে মুক্ত। পরিভাষাগত অর্থে মুসলমানদের পরস্পর সাক্ষাতে আসসালামু আলাইকুম বলে দুয়া কামনা, নিরাপত্তা দান ও কুশল বিনিময়কে সালাম বলা হয়। সালাম ইসলামের শিক্ষার মধ্য অন্যতম ওলামায়ে কিরামের ইজমা হয়েছে যে, সালাম দেয়া সুন্নত। আর সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব। অবশ্য কারো কারো মতে সালামের মতো উত্তর দেয়াও সুন্নত। নামাজরত ব্যক্তি,পানাহাররত অবস্থা, মল-মুত্র ত্যাগ, কুরআন তিলায়াত অবস্থায় সালাম দেয়া ও উত্তর প্রদান করা মাখরুহ।
হাদীসের আলোকে আদাব ও সালামঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন- যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পুর্ণ ঈমান আনবেনা ,ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা। আর তোমরা পুর্ণ ঈমানদার হতে পারবেনা, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে।
ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন- আমি কি তোমাদেরকে এমন এক জিনিসের সন্ধান দিব না যা তোমরা পালন করলে পারস্পারিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? (তা হলো) তোমরা নিজেদের মধ্য সালামের ব্যপক প্রচলন কর।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন-
আরোহী ব্যক্তি পদব্রজে গমনকারী ব্যক্তিকে, পদব্রজে গমনকারী ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তিকে এবং কমসংখ্যক লোক বেশী সংখ্যক লোককে সালাম দেবে। বুখারী-মুসলিম (৪৪৩৭/৭)
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একবার কিছু সংখ্যক বালকের নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করলেন এবং তাদের কে সালাম দিলেন। বুখারী-মুসলিম

বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ মুক্তির দূত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে মুসলিম ভাতৃত্ব সুদৃঢ় ও মজবুত হবে। কিভাবে মানুষকে সন্মান দিতে হবে। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন সুন্নাহ যার অনুকরণ করলে আমাদের মধ্য সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। দুনিয়ায় সম্মানের জীবন যাপন করতে পারবো আর আখিরাতের অনন্ত জীবনে থাকবে শান্তি আর শান্তি। তাই আসুন আমরা সকলে আল্লাহর কিতাব কুরআন এরং রাসুলের (সাঃ) সুন্নাহ মেনে চলি তাহলে পথভ্রষ্ট হবনা।

কেনো আপনি ইসলামিক জীবন ব্যবস্থা চান না

আপনি বলছেন, আপনি একজন মুসলিম। আপনার বাবা-দাদা মুসলিম ছিল। সেই সূত্রে আপনিও মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়ে মুসলিম হয়েছেন। কিন্তু আপনি কি একজন মুসলিমের মত আচরন করছেন?

একজন মুসলিম অবশ্যই ইসলামিক নিয়মে চলবে। ইসলামিক নিয়মে চলার মানে কি? মানে হলো- তার কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক পরিচ্ছদ, অর্থ উপার্জন ও খরচ, ইবাদত প্রনালী ইত্যাদি জীবনের যা কিছু লাগে সেটা আল্লাহ্‌র নিয়মে পালন করা।
যদি মুসলিম হিসাবে নিজেকে দাবি করেন, তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, সত্যি কি আপনি আল্লাহ্‌র নিয়মগুলো পালন করছেন? ইসলামে বলা আছে মদ খাওয়া যাবে না, কিন্তু আপনি খাচ্ছেন। ইসলামে বলা আছে, সুদ খাওয়া যাবে না, আপনি খাচ্ছেন। ঘুষ খাওয়া যাবে না, আপনি খাচ্ছেন। ইসলাম বলে আপনাকে পর্দা করতে, কিন্তু আপনি করছেন না। ইসলাম বলে শিরক ছাড়া ইবাদত করতে, আপনি শিরক করছেন। ইসলাম বলে হালাল-হারাম মেনে চলতে, কিন্তু আপনি তা করছেন না। এরকম বহু কিছু বলা যায়। যার উত্তর হবে নেগেটিভ। কিন্তু তারপরেও আপনি বলেন যে আপনি মুসলিম। কিভাবে বলেন?

এই দুনিয়াটা তো একটা পরীক্ষা স্বরূপ, সেটা আপনি মানেন অথবা না মানেন। আপনি সারা বছর চলছেন নিজের নিয়মে কিন্তু বলছেন মুসলিম হিসাবে দুনিয়াতে চলছি । সারা বছর রাজউক স্কুলে পড়ে আপনি এখন O Level দিতে চান। ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে গেলো না।

ধরা যাক আপনি একজন নারী। নিজেকে মুসলিম নারী বলছেন। মুসলিম মানে হলো যে আল্লাহ্‌র আদেশ নিষেধ মেনে চলবে। তাহলে আপনি কেনো পর্দা মেনে চলছেন না ? আল্লাহ্‌ তো পর্দার নির্দেশ দিয়েছেন। নিজে পর্দা করছেন না আবার যারা পর্দা করছে তাঁদের কটাক্ষ করছেন। আপনার কেনো মনে হয় যে, পর্দা করলে নারী পিছিয়ে পড়বে? নারীদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হবে? নারীদের ঘর হতে বের হওয়া যাবে না ? নারীরা চাকরি করতে পারবে না ? আপনি নারী অথবা পুরুষ যাই হোন না কেনো, ইসলামের অন্য বিধান গুলোর ব্যাপারগুলোতেও আপনার এমন নেগেটিভ চিন্তা আসে। কেনো আসে?

কারণ আপনার এসব চিন্তা ছোট বেলাতেই আপনার মাথাতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার বাবা-মা, আপনার স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আপনার বন্ধু বান্ধব, আপনার নাটক-সিনেমা, আপনার বই- অর্থাৎ আপনার আশেপাশের পরিবেশ আপনার মনের ভিতর এই ভুল চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে।অবাক হচ্ছেন? কিন্তু এটাই সত্যি।

আপনিতো অনেক পড়াশুনা করেন, জানেন, বড় বড় অনেক ডিগ্রীও হয়তো আপনার ঝুলিতে। কিন্তু আপনি কখনো ইসলামের আদেশ নিষেধ নিয়ে, নিয়ম কানুন নিয়ে পড়েছেন ? ইসলামে কি কোথাও আছে নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখার কথা? নারীর অবমাননার কথা? আপনি পড়ুন, যাচাই করুন।

আমার পরিচিত একজন ষাটোর্দ্ধ মহিলা আছেন। কোন এক অজানা কারণে তিনি বিয়ে করেননি। জীবনটাকে তিনি নারী আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা করেই কাটিয়ে দিচ্ছেন। তার গবেষণার লেখাগুলো পড়লে অনেক ভালো লাগে। নিজের দেশের মেয়েদের অবস্থার কথা জানা যায়। উনাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপা, আপনি তো কত জানেনে, বুঝেন কিন্তু কোরআন টা পড়েন না কেনো?” উত্তরে বলেছিলেন, “ভয় লাগে, আরবি বুঝি না। তার উপর বাংলা অনুবাদ ঠিক না বেঠিক কিভাবে বুঝবো”।  “সব আলেম যেটা প্রাধান্য দিয়েছেন সেটা পড়লেই তো আর সমস্যা নেই”।  “নাহ, পড়তে ইচ্ছা করে না। পড়লেই তো মানতে হবে”।

এখন বলি, কেনো আপনি ব্যক্তি জীবনে, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে ইসলামিক নিয়ম মেনে চলতে চাচ্ছেন না বা ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন না। কারণ আপনিও ভয় পান। আপনি ভয় পান যে, ইসলামিক নিয়ম মানলে আর স্বেচ্ছাচারিতা থাকবে না, নিজের খেয়াল খুশী মত চলা যাবে না, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা যাবে না, নিজের আধিপত্য বিস্তার করা যাবে না। বাকস্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা তাই বলতে পারবেন না। তাই আপনার মনে হবে কোরআন এইটা না বললেই পারতো। কোরআন এর কিছু অংশ আপনি সুবিধা মত মানবেন। মেনে বলবেন যে, দেখো আমি তো কোরআন মানছি। আবার নিজের সুবিধা মত ব্যাখ্যা করে নিবেন। বলবেন যে, দেখো কোরআন তখনকার সময় অনুযায়ী নাযিল হয়েছিল। তাই ব্যাপারটা এই যামানার সাথে যায় না। আপনি হতে চান একজন মডারেট মুসলিম।

আপনি কোরআন পড়ুন, সব কিছু যাচাই করুন। বুঝতে না পারলে কোন আলেমের সাহায্য নিন। যাচাই করার পরে, বুঝার পরেও যদি আপনি না মানেন তাহলে বুঝতে হবে আপনি ধরা খেয়ে গিয়েছেন। আপনার আত্মা ধরা খেয়ে গিয়েছে। ধরা খেয়ে গিয়েছে শয়তানের হাতে। আর আল্লাহ্‌ তো বলেই দিয়েছেন যে, শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শ্ত্রু। আপনি আপনার শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত।

  ইসলামের দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ / New Year.

নববর্ষ বা New Year’s day – এই শব্দগুলো নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, রাতে অভিজাত এলাকার ক্লাব ইত্যাদিতে মদ্যপান তথা নাচানাচি, পটকা ফুটানো – এই সবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৭ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন ? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা

অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হত ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল এই যে, ঐ দিন খ্রীস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাত হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

    “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ (আনন্দের দিন) রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” [বুখারী, মুসলিম]

বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন:

“উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

    ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ [আল-মায়িদাহ :৪৮]‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ [আল-হাজ্জ্ব :৬৭]

যেমনটি কিবলাহ, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।…নিঃসন্দেহে তাদের সাথে এসব অনুষ্ঠান পালনে যোগ দেয়া একজনকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা.) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন:

    ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ (আনন্দের দিন) রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ [বুখারী, মুসলিম]

এছাড়া আনাস ইবনে মালিক(রা.) বর্ণিত:

    “রাসূলুল্লাহ(সা.) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি(সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ(সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর ।’ ” [সূনান আবু দাউদ]

এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়, এবং এই বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, যা হচ্ছে:

অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর কারণে।

অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন:

    “আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।” [সূরা যারিয়াত:৫৬]

সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা ।

তাইতো দেখা যায় যে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ পালন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালনের পর পরই মুসলিমরা পালন করে ঈদুল ফিতর, কেননা এই দিনটি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারীর জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন – এদিন এজন্য উৎসবের নয় যে এদিনে আল্লাহর দেয়া আদেশ নিষেধ কিছুটা শিথিল হতে পারে, যেমনটি বহু মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দিনে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, বরং মুসলিমের জীবনে এমন একটি মুহূর্তও নেই, যে মুহূর্তে তার ওপর আল্লাহর আদেশ নিষেধ শিথিলযোগ্য। তেমনিভাবে ঈদুল আযহা পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হাজ্জ পালনের প্রাক্কালে। কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে ইয়াওমুল আরাফা, এদিনটি আরাফাতের ময়দানে হাজীদের ক্ষমা লাভের দিন, আর তাই ১০ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন – ঈদুল আযহা। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটো দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন – এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।

নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক

নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মু্হাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীজীর(সা.) মৃত্যুর বহু পরে, উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্য কোন নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?

কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে আল্লাহ এই উপলক্ষের দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:

    “নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদাহ :৭২]

নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোন কোন সূত্রে দাবী করা হয় , যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব: সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

pohela-baishakh-1397206183-9792

নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন

আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: পটকা ফুটিয়ে বা আতশবাজি পুড়িয়ে রাত ১২টায় হৈ হুল্লোড় করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের শান্তি বিনষ্ট করে নববর্ষকে স্বাগত জানানো, ব্যান্ড সঙ্গীত বা অন্যান্য গান-বাজনার ব্যবস্থা, সম্ভ্রান্ত পল্লীর বাড়ীতে বা ক্লাবে গান-বাজনা, মদ্যপান ও পান শেষে ব্যভিচারের আয়োজন ইত্যাদি – এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র ও “রাশিফল” প্রকাশ।

এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকান্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক:

নতুন দিন তথা সূর্যকে স্বাগত জানানো:

এ ধরনের কর্মকান্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রীস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনি ভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রীস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রীস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রীস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়। ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির সাথে আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “ক্লাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে তুলে ধরেছেন:

    “আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…”[সূরা আন নামল :২৪]

নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা:

নববর্ষের পার্টি বা “উদযাপন আয়োজনের” অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নারীর সহজ-লভ্যতা – নিউ-ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারে অথবা ঢাকার গুলশান ক্লাবে – পশ্চিমেও এবং তাদের অনুকরণে এখানেও ব্যাপারটা একটা অলিখিত প্রলোভন। নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। নববর্ষের পার্টি বা উদযাপন আয়োজনের সবর্ত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকষর্ণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন:

    “আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।” [বুখারী ও মুসলিম]

সমাজ নারীকে কোন অবস্থায়, কি ভূমিকায়, কি ধরনের পোশাকে দেখতে চায় – এ বিষয়টি সেই সমাজের ধ্বংস কিংবা উন্নতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। নারীর বিচরণক্ষেত্র, ভূমিকা এবং পোশাক এবং পুরুষের সাপেক্ষে তার অবস্থান – এ সবকিছুই ইসলামে সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ দ্বারা নির্ধারিত, এখানে ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রথা, হালের ফ্যাশন কিংবা ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের কোন গুরুত্বই নেই। যেমন ইসলামে নারীদের পোশাকের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়া আছে, আর তা হচ্ছে এই যে একজন নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয় ছাড়া দেহের অন্য কোন অঙ্গই বহিরাগত পুরুষেরা দেখতে পারবে না।

বহিরাগত পুরুষ কারা? স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীদের পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, মুসলিম নারী, নিজেদের মালিকানাধীন দাসী, যৌনকামনাহীন কোন পুরুষ এবং এমন শিশু যাদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে সংবেদনশীলতা তৈরী হয়নি, তারা বাদে সবাই একজন নারীর জন্য বহিরাগত। এখানে ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের প্রশ্ন নেই। যেমন কোন নারী যদি বহিরাগত পুরুষের সামনে চুল উন্মুক্ত রেখে দাবী করে যে তার এই বেশ যথেষ্ট শালীন, তবে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শালীনতা-অশালীনতার সামাজিক মাপকাঠি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, আর তাই সমাজ ধীরে ধীরে নারীর বিভিন্ন অঙ্গ উন্মুক্তকরণকে অনুমোদন দিয়ে ক্রমান্বয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে যে, যেখানে বস্তুত দেহের প্রতিটি অঙ্গ নগ্ন থাকলেও সমাজে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় – যেমনটা পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশন শিল্পে দেখা যায়। মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা ভারতবর্ষে যা শালীন, বাংলাদেশে হয়ত এখনও সেটা অশালীন – তাহলে শালীনতার মাপকাঠি কি? সেজন্য ইসলামে এধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে মানুষের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং তা কুরআন ও হাদীসের বিধান দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে। তেমনি নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এই অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। যিনা-ব্যভিচার ইসলামী শরীয়াতের আলোকে কবীরাহ গুনাহ, এর পরিণতিতে হাদীসে আখিরাতের কঠিন শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এর প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি। আল্লাহর রাসূলের হাদীস অনুযায়ী কোন সমাজে যখন ব্যভিচার প্রসার লাভ করে তখন সে সমাজ আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে ওঠে। আর নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসা উদ্রেককারী অপরাপর যেসকল মাধ্যম, তা যিনা-ব্যভিচারের রাস্তাকেই প্রশস্ত করে।

এ সকল কিছু রোধ করার জন্য ইসলামে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথক করা এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সমাজ নারীকে অশালীনতায় নামিয়ে আনে, সেই সমাজ অশান্তি ও সকল পাপকাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়, কেননা নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের চরিত্রে বিদ্যমান অন্যতম অদম্য এক স্বভাব, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সামাজিক সমৃদ্ধির মূলতত্ত্ব। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের ফলাফল দেখতে চাইলে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকানোই যথেষ্ট, গোটা বিশ্বে শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঝান্ডাবাহী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয় মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তথাকথিত সভ্য দেশে মানুষের ভিতরকার এই পশুকে কে বের করে আনল? অত্যন্ত নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেও সহজেই বুঝতে পারে যে, স্রষ্টার বেঁধে দেয়া শালীনতার সীমা যখনই শিথিল করা শুরু হয়, তখনই মানুষের ভিতরকার পশুটি পরিপুষ্ট হতে শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের অশালীনতার চিত্রও কিন্তু একদিনে রচিত হয়নি। সেখানকার সমাজে নারীরা একদিনেই নগ্ন হয়ে রাস্তায় নামেনি, বরং ধাপে ধাপে তাদের পোশাকে সংক্ষিপ্ততা ও যৌনতা এসেছে, আজকে যেমনিভাবে দেহের অংশবিশেষ প্রদর্শনকারী ও সাজসজ্জা গ্রহণকারী বাঙালি নারী নিজেকে শালীন বলে দাবী করে, ঠিক একইভাবেই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেহ উন্মুক্তকরণ শুরু হয়েছিল তথাকথিত “নির্দোষ” পথে।

নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন নিয়ে ইসলামের বিধান আলোচনা করা এই নিবন্ধের আওতা বহির্ভূত, তবে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা চিত্র ইতিমধ্যেই তুলে ধরা হয়েছে। এই বিধি-নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা – তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের কাছে যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয়ই হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ৩ বছরের বালিকা ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন, পিতার সম্মুখে কন্যা এবং স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীর শ্লীলতাহানি – বাংলাদেশের সমাজে এধরনের বিকৃত ঘটনা সংঘটনের প্রকৃত কারণ ও উৎস কি? প্রকৃতপক্ষে এর জন্য সেইসব মা-বোনেরা দায়ী যারা প্রথমবারের মত নিজেদের অবগুন্ঠনকে উন্মুক্ত করেও নিজেদেরকে শালীন ভাবতে শিখেছে এবং সমাজের সেইসমস্ত লোকেরা দায়ী, যারা একে প্রগতির প্রতীক হিসেবে বাহবা দিয়ে সমর্থন যুগিয়েছে।

ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের ক্লাসিকাল ট্রিকগুলোর অপর একটি, যেটাকে কুরআনে “ফাহিশাহ” শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে, শয়তানের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

    “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কর আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু । সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ [ব্যভিচার, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি] করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।” [সূরা আল বাকারা :১৬৮-১৬৯]

এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা:

    “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২]

ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।বিভিন্ন সাজে সজ্জিত পর্দাবিহীন নারীকে আকর্ষণীয়, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অভিজাত বলে মনে হতে পারে, কেননা, শয়তান পাপকাজকে মানুষের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। যেসব মুসলিম ব্যক্তির কাছে নারীর এই অবাধ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে সুখকর বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য:

ক. ছোট শিশুরা অনেক সময় আগুন স্পর্শ করতে চায়, কারণ আগুনের রং তাদের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আগুনের মূল প্রকৃতি জানার পর কেউই আগুন ধরতে চাইবে না। তেমনি ব্যভিচারকে আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং আখিরাতে এর জন্য যে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, সেটা স্মরণ করলে বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে হবে না।

খ. প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, একজন নারী যখন নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে সজ্জিত হয়ে বহু পুরুষের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের মনে যৌন-লালসার উদ্রেক করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে এবং সেই নারীকে দেখে বহু-পুরুষের মনে যে কামভাবের উদ্রেক হয়, সেকথা চিন্তা করে এই নারীর বাবার কাছে তার কন্যার নগ্নতার দৃশ্যটি কি খুব উপভোগ্য হবে? এই নারীর সন্তানের কাছে তার মায়ের জনসম্মুখে উন্মুক্ততা কি উপভোগ্য? এই নারীর ভাইয়ের কাছে তার বোনের এই অবস্থা কি আনন্দদায়ক? এই নারীর স্বামীর নিকট তার স্ত্রীর এই অবস্থা কি সুখকর? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কিভাবে একজন ব্যক্তি পরনারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনকে পছন্দ করতে পারে? এই পরনারী তো কারও কন্যা কিংবা কারও মা, কিংবা কারও বোন অথবা কারও স্ত্রী? এই লোকগুলোর কি পিতৃসুলভ অনুভূতি নেই, তারা কি সন্তানসুলভ আবেগশূন্য, তাদের বোনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ স্নেহশূন্য কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীসুলভ অনুভূতিহীন?

নিশ্চয়ই নয়। বরং আপনি-আমি একজন পিতা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হিসেবে যে অনুভূতির অধিকারী, রাস্তার উন্মুক্ত নারীটির পরিবারও সেই একই অনুভূতির অধিকারী। তাহলে আমরা আমাদের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য যা চাই না, তা কিভাবে অন্যের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য কামনা করতে পারি? তবে কোন ব্যক্তি যদি দাবী করে যে, সে নিজের কন্যা, মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীকেও পরপুরুষের যথেচ্ছ লালসার বস্তু হতে দেখে বিচলিত হয় না, তবে সে তো পশুতুল্য, নরাধম। বরং অধিকাংশেরই এধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই আমাদের উচিৎ অন্তর থেকে এই ব্যভিচারের চর্চাকে ঘৃণা করা। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি নবীজী(সা.) বর্ণনা করেছেন:

  “…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।” [বুখারী ও মুসলিম]

দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

সঙ্গীত ও বাদ্য:

নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। ইসলামে নারীকন্ঠে সংগীত নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ – একথা পূর্বের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট। সাধারণভাবে যে কোন বাদ্যযন্ত্রকেও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিশেষ কিছু উপলক্ষে দফ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুমতি হাদীসে এসেছে। তাই যে সকল স্থানে এসব হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য হারাম। কিন্তু কোন মুসলিম যদি এতে উপস্থিত থাকার ফলে সেখানে সংঘটিত এইসকল পাপাচারকে বন্ধ করতে সমর্থ হয়, তবে তার জন্য সেটা অনুমোদনযোগ্য। তাছাড়া অনর্থক কথা ও গল্প-কাহিনী যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প-কাহিনী এবং গান-বাজনা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন:

    “এবং তাদের মধ্যে যাদেরকে পার পর্যায়ক্রমে বোকা বানাও তোমার গলার স্বরের সাহায্যে, … ” [সূরা বনী ইসরাঈল :৬৪]

যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহবান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত। [তফসীর ইবন কাসীর]

আল্লাহ আরও বলেন:

  “এবং মানুষের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে [মানুষকে] বিচ্যুত করার জন্য কোন জ্ঞান ছাড়াই অনর্থক কথাকে ক্রয় করে, এবং একে ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” [সূরা লোকমান :৬]

রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন:

“আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।” [বুখারী]

এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক ও পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসূলের হাদীসে।

যে সকল মুসলিমদের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিৎ এসবকিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।

আমাদের করণীয়

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এজন্য যে, এতে নিম্নোলিখিত চারটি শ্রেণীর ইসলাম বিরোধী বিষয় রয়েছে:

১. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত
২. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান
৩. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান
৪. সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ

এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে, নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা এবং মুসলিম সমাজ থেকে এই প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে:

– এ বিষয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে আইন প্রয়োগের দ্বারা নববর্ষের যাবতীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।

– যেসব ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এই নির্দেশ জারি করতে পারেন যে, তার প্রতিষ্ঠানে নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান পালিত হবে না, নববর্ষ উপলক্ষে কেউ বিশেষ পোশাক পরতে পারবে না কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবে না।

– মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লীদেরকে সচেতন করবেন ও বিরত থাকার উপদেশ দেবেন।

– পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়। (এটুকু ইনশা’আল্লাহ্ চাইলে সবাই/অনেকেই করতে পারবেন)

– এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দেবেন এবং নববর্ষ পালনের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন, এবং কল্যাণ ও শান্তি বর্ষিত হোক নবী(সা.)-এঁর ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।

  “এবং তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার পরিধি আসমান ও জমীনব্যাপী, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।” [সূরা আলে-ইমরান:১৩৩]

প্রচলিত ভুলঃ বিদায়ের সময় ‘খোদা হাফেজ’ বলা কি ঠিক? বিদায়ের সময়ের সুন্নত আমল কী?

আমাদের দেশে অনেককেই দেখা যায় তারা বিদায়ের সময় বা চলে যাওয়ার সময় খোদা হাফেজ বা আল্লাহ হাফেজ বলে থাকেন। বিদায়ের সময় এটা বলা কি ঠিক? বিদায়ের সময়ের সুন্নত আমল কী?

-সাক্ষাতের সময় যেমন সালাম দেয়া সুন্নত, তেমনি বিদায়ের সময়েও সালাম দিয়ে বিদায় নেওয়া সুন্নত। এ সম্পর্কে একাধিক হাদীস আছে। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- ”যখন তোমাদের কেউ কোন মজলিসে পৌছবে, তখন সালাম দিবে। যদি অনুমতি পাওয়া যায়, তবে বসে পড়বে। এরপর যখন মজলিস ত্যাগ করবে তখনও সালাম দিবে। কারণ প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালম অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়। অর্থাৎ উভয়টির গুরুত্ব সমান।””
-জামে তিরমিযী ২/১০০

সুতরাং বিদায়ের সময়ও ইসলামের আদর্শ এবং সুন্নত হল সালাম দেয়া। তাই সালামের স্হলে বা এর বিকল্প হিসাবে ‘খোদা হাফেজ বা আল্লাহ হাফেজ’ বা এ জাতীয় কোন কিছু বলা যাবে না। অবশ্য সালামের আগে পৃথক ভাবে দুআ হিসাবে ‘খোদা হাফেজ বা আল্লাহ হাফেজ’ বলা দোষের কিছু নয়।

ইসলামিক দৃষ্টিতেঃ সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে করণীয়

সুখী সমৃদ্ধ দাম্পত্য জীবন গঠনে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ভূমিকা থাকে। আর এটা সব সময় এক রকম থাকে না। কখনো কমে কখনো বাড়ে।

সেটা আল্লাহর রহমতের পর নির্ভর করে তাদের উভয়ের চেষ্টার উপর। কিন্তু স্ত্রী এ ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

আরবী সাহিত্য জগতের সাহিত্য ও বাগ্মিতায় একজন প্রসিদ্ধ নারী উমামা বিনতে হারেস (আউফ ইবনে মুহাল্লাম আশ শায়বানীর স্ত্রী) তার মেয়েকে বিয়ের পর অতি গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় উপদেশ দিয়ে ছিলেন যা আরবদের মাঝে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সে উপদেশগুলোর অনুবাদ তুলে ধরা হল। সেই সাথে আধুনিক যুগের একজন প্রসিদ্ধ দাঈ এবং আলেম স্বামীর ভালবাসা অর্জনের জন্য স্ত্রীর প্রতি বেশ কিছু মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন সেগুলোও উপস্থাপন করা হল। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যেন সব সময় কল্যাণের উপর অটুট রাখেন। আমীন।

এক আরব মা তার মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর উপদেশ দিচ্ছেন:
উমামা বিনতে হারেছ নিজ কন্যার বিবাহের সময় তাকে এমন কিছু নসীহত করেন যা শুধু মেয়ের জন্যই নয়; বরং পরবর্তী সমস্ত নারীর জন্য মাইল ফলক হিসেবে অবশিষ্ট থাকবে।

তিনি মেয়েকে লক্ষ্য করে বলেন, ওহে আমার কলিজার টুকরা মেয়ে! আজ তুমি নিজের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বান্ধবী ও প্রতিবেশী থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে এমন এক অপরিচিত পরিবেশে এমন এক অপরিচিত ব্যক্তির নিকট গমণ করছো যেখানেই রয়েছে তোমার আসল ঠিকানা সেই ব্যক্তিই তোমার প্রকৃত বন্ধু সাথী ও কল্যাণকামী। তুমি ওখানের আচার-আচরণ ও পরিবেশ সম্পর্কে মোটেও অবগত নও। তুমি যদি স্বামীর দাসী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পার, তবে দেখবে সেও তোমার দাসে পরিণত হয়েছে।

এই মূহুর্তে আমি তোমাকে কতিপয় নসীহত করছি। আল্লাহ চাহে তো এগুলো তোমার জীবনের সাফল্য ও সুখি দাম্পত্য জীবনের জন্য পাথেয় হবে।

• স্বামীর প্রতি বিনীত থাকবে এবং অল্পতেই তার উপর সন্তুষ্ট হবে।
• ভালভাবে তার কথা শুনবে ও মানবে।
•তার চোখ ও নাকের পসন্দের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। তোমাকে যেন কখনো খারাপ দৃশ্যে সে না দেখে এবং তোমার নিকট থেকে কখনো যেন সর্বোত্তম সুগন্ধি ছাড়া অন্য কিছু না পায়।
•তার খাওয়া দাওয়া ও নিদ্রার বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখবে। কেননা ক্ষুধা ও অনিদ্রা মানুষকে বদমেজাজী ও ক্রোধাম্বিত করে তোলে।
• তার ধন-সম্পদের রক্ষণা-বেক্ষণ করবে। হিসাবের সাথে পরিমাণমত তার সম্পদ খরচ করবে।
• তার পরিবার-পরিজন ও দাস-দাসীর দেখাশোনা করবে। উত্তমভাবে মনযোগসহকারে তার সন্তান-সন্তুানতিকে লালন-পালন করবে।
• তার কোন গোপন বিষয় ফাঁস করবে না ও তার নাফরমানী করবে না। কেননা তার গোপন তথ্য ফাঁস করে দিলে একদিন সে তোমাকে ধোঁকা দিবে। অবাধ্য হলে তার বুকে আগুন জ্বালাবে তাকে ক্রোধাম্বিত করবে।
• তুমি কাঙ্খিত লক্ষ্যে কখনই পৌঁছতে পারবে না যে পর্যন্ত তার সন্তুষ্টিকে নিজের সন্তুষ্টির উপর সন্তান না দিবে, তার পছন্দ-অপছন্দকে নিজের পছন্দ-অপছন্দের উপর সন্তান না দিবে। (আ’লামুন্নেসা ১/৭৪, ত্বাবায়েউন্নেসা পৃঃ ২৮)
স্বামীর প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধির জন্য স্ত্রীকে কতিপয় উপদেশঃ
শায়খ ইবনু জুবাইলান স্বামীর ভালবাসা ও প্রীতি অর্জন করার জন্য নারীদেরকে উদ্দেশ্যে করে কিছু নসীহত করেছেন। তা নিম্নরূপঃ

• বিভিন্ন উপলক্ষে স্বামীর হাতে কপালে চুম্বন করা।

• স্বামী বাইরে থেকে এলে সাথে সাথে স্বাগতম জানানোর জন্য দরজায় এগিয়ে আসা। তার হাতে কোন বস’ থাকলে তা নিজের হাতে নেয়ার চেষ্টা করা।

• সময় ও মেজাজ বুঝে স্বামীর সামনে প্রেম-ভালবাসা মিশ্রিত বাক্যালাপ করা। তার সামনে তার প্রশংসা করা। সম্মান ও শ্রদ্ধা মূলক আচরণ করা।

• স্বামীর পোশাক-আশাকের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা। (পরিচ্ছন্ন পুরুষ মানেই তার স্ত্রী পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন)।

• সর্বদা স্বামীর সামনে হাসি মুখে থাকা।

• স্বামীর জন্য নিজেকে সুসজ্জিত রাখা। শরীরে দুর্গন্ধ থাকলে বা রান্না ঘরের পোষাকে তার সম্মুখে না যাওয়া। মাসিক ঋতুর সময়ও সুসজ্জিত অবস্থায় থাকা।

• স্বামীর সামনে কখনই নিজের কন্ঠকে উঁচু না করা। নারীর সৌন্দর্য তার নম্র কন্ঠে।

• সন্তানদের সামনে স্বামীর প্রশংসা ও গুণগান করা।

• নিজের এবং স্বামীর পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের সামনে আল্লাহর কৃতজ্ঞতার সাথে সাথে স্বামীর প্রশংসা করা ও তার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। কখনই তার বিরুদ্ধে তাদের নিকট অভিযোগ করবে না।

• সুযোগ বুঝে স্বামীকে নিজ হাতে লোকমা তুলে খাওয়ানো।

• কখনো স্বামীর আভ্যন-রীন গোপন বিষয় অনুসন্ধান না করা। কেননা কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, ((ولا تجسسوا)) “তোমরা কারো গোপন বিষয় অনুসন্ধান কর না। (সূরা হুজুরাত -১৩) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা কারো প্রতি কুধারণা থেকে বেঁচে থাক। কেননা ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। (বুখারী, অধ্যায়ঃ বিবাহ, হা/৪৭৪৭।)

• স্বামী কখনো রাগম্বিত হলে চুপ থাকার চেষ্টা করা। সম্ভব হলে তার রাগ থামানোর চেষ্টা করা। যদি সে নাহক রেগে থাকে তবে অন্য সময় তার মেজাজ বুঝে সমঝোতার ব্যবসন্তা করা।

• স্বামীর মাতাকে নিজের পক্ষ থেকে (সাধ্যানুযায়ী) কিছু হাদিয়া-উপহার প্রদান করা।

• সম্পদশালী হয়ে থাকলে স্বামীর অভাব অনটনের সময় তাকে সহযোগিতা করা। উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! (আমার স্বামী) আবু সালামার সন্তানদের জন্য যদি আমি অর্থ ব্যয় করি তবে কি তাতে আমি প্রতিদান পাব। ওদেরকে তো এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না। ওরা তো আমারও সন্তান। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি যে পরিমাণ তাদের জন্য সম্পদ খরচ করবে, তোমাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

• স্বামীর নির্দেশ পালন, তার এবং তার সংসারের খেদমত প্রভৃতির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করা।

 স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব

ইসলাম এমন একটি ধর্ম যেখানে ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক সকল বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। এমন কোন বিষয় বাদ নেই যা সম্পর্কে ইসলাম নির্দেশনা প্রদান করেনি। আমরা যদি ইসলামের নিয়ম-কানূন মোতাবেক জীবন পরিচালিত করি তাহলে সকল প্রকার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকতে পারি। আর ইসলামের নবী শ্রেষ্ঠ নবী, খাতামান্নাবীঈন (সাঃ) নিজ জীবনে সব বিষয়ে আমল করে দেখিয়ে গেছেন কিভাবে তা পালন করতে হয়। হজরত রাসূল করিম (সাঃ) মানব শরীর কর্তৃক প্রত্যেক প্রকারের অপবিত্রতা ও নোংরামী সৃষ্টির উৎসমূলকে কঠোরতার সাথে দমন করে সেগুলোর মুন্ডপাত করেছেন। এছাড়া তিনি রোগ বিসত্মারের অন্যান্য ড়্গত্রেকেও চিহ্নিত করেছেন। আজ আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা দ্বারাও এটা প্রমাণিত। বর্তমানে মারাত্মক কিছু রোগ ও মহামারীর বিসত্মার বিশেষত দু’টি কারণে হয়ে থাকে, যেমন-(১) আমরা আমাদের কফ, থুথু, নির্দ্বিধায় অলিতে-গলিতে, পথে-ঘাটে, খোলা জায়গায় ফেলে থাকি। এই নিড়্গপ্তি কফ-থুথুর বিষাক্ত জীবাণুগুলি বাতাসের সাথে মিশে নাক-মুখের মাধ্যমে সুস’্য ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে। (২) যখন বিভিন্ন প্রকারের পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ এই নিড়্গপ্তি আবর্জনায় মুখ দিয়ে খাদ্য-দ্রব্য বা পানিতে এসে পড়ে যার সাথে করে তারা অসংখ্য জীবাণু বয়ে নিয়ে আসে, যেগুলি পানি ও খাবারের সাথে মিশে মহামারী ভয়াবহ বিসত্মার ঘটায়। আর এ জন্যই সারাদেশে আজ বিভিন্ন রোগে হাজার হাজার অকাল মৃত্যু ঘটছে। কলেরা হাসপাতালে বা যে কোন হাসপাতালে গেলে দেখা যায় রোগীর অভাব নেই।
হজরত রাসূল করিম (সাঃ)-এর এমন অসংখ্য উপদেশবাণী রয়েছে যার ওপর আমল করলে এ সকল রোগের হাত থেকে বাঁচা যায়। উদাহরণস্বরূপ তিনি রাতের বেলায় পেস্নট, হাড়ি-পাতিল, গস্নাস প্রভৃতি খোলা না রাখতে বলেছেন। কেননা বিভিন্ন প্রকারের পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ রাতের বেলায় উড়ে বেড়ায় এবং সেগুলির আকর্ষণ সাধারণত খাদ্য-দ্রব্যের প্রতিই হয়। একটি হাদিস হজরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূল করিম (সাঃ) বলেছেন-“সন্ধ্যা হয়ে গেলে তোমরা তোমাদের সনত্মানদের ঘর থেকে বের হতে দিও না কেননা শয়তান সেই সময় চারিদিকে ঘোরাফেরা করে। (হাদীসের দৃষ্টিতে শয়তানকে পারিভাষিক অর্থে বুঝিয়ে এর আওতায় চোর, ডাকাত, কুকুর অন্যান্য হিংস্র জন’, সাপ, বিচ্ছু, বিষাক্ত পোকা-মাকড় এবং ব্যাকটেরিয়া অনত্মর্ভুক্ত বলে বুঝানো হয়েছে) যখন রাতের একটি অংশ অতিবাহিত হয় তখন বিসমিলস্নাহ্ বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দাও কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। পানির পাত্র বিসমিলস্নাহ্ বলে ঢাকনা বা পর্দা দিয়ে ঢেকে দাও এবং বাতি নিভিয়ে দাও” [বুখারী, মুসলিম]।
এটা মনে করা সমীচীন নয় রাসূল (সাঃ) রাতের বেলায় কেবলমাত্র খাদ্যদ্রব্য ঢেকে রাখার উপদেশ দিয়েছেন বরং দিনের বেলাতেও খাবারের পাত্রাদি ঢাকার নির্দেশ দিয়ে এ কথার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন যে, দিনের বেলাতেও বিভিন্ন জীবাণু বাতাসের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। নিম্নোক্ত হাদিস পাঠে আমরা তা জানতে পারি-এক আনসারী সাহাবীর নাম আবু হামিদ, সে ব্যক্তি নওকি নামক স’ান থেকে এক পেয়ালা দুধ তোহফাস্বরূপ আনল। রাসূল (সাঃ) তাকে বললেন, ‘তুমি কেন এটি না ঢেকে এনেছ। তুমিতো কমপড়্গে একটি কাঠের খন্ডও এর ওপর রেখে দুধের পেয়ালাটি ঢেকে আনতে পারতে’। [বুখারী, মুসলিম]
যত্রতত্র কফ-থুথু না ফেলার জন্য রাসূল (সাঃ) আমাদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস থেকে এ সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি। মসজিদের বারান্দায় থুথু ফেলে সেটিকে না মিটানোকে রাসূল (সাঃ) গুনাহের কাজ বলে উলেস্নখ করেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহর কাজ। এর কাফফারা হল যদি থুথু ফেলাই হয় তা যেন মিটিয়ে দেয়া হয়।” [বুখারী] এই হাদিসে বিশেষভাবে মসজিদ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কথা এজন্য বলা হয়েছে, মসজিদ সর্বাধিক ব্যবহৃত একটি গুরূত্বপূর্ণ স’ান। এটি পরিচ্ছন্ন সৌন্দর্য বর্ধ্বনকারী জায়গাও বটে। সামান্য অসাবধানতাবশত এস’ান থেকে রোগ ব্যাধি মানুষের মাঝে ছড়াতে পারে। গভীর দৃষ্টি দিয়ে যদি অন্যান্য পাবলিক স’ানগুলির দিকেও লড়্গ্য করা হয় তাহলে সে স’ানগুলোতেও যত্রতত্র কফ-থুথু না ফেলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রোগ-জীবাণু বিসত্মার অনেকটা রোধ করা যেতে পারে।
ইসলাম গোসল করার জন্য কিছু নসীহত করা পর্যনত্মই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং এড়্গেেত্র সময় ও প্রয়োজনানুসারে কোন কোন গোসলকে ওয়াজিব আবার কোন কোন গোসলকে ফরজ বলে চিহ্নিত করেছে। জুমার দিনে গোসল করার ব্যাপারে বুখারি শরিফে নিম্নোক্ত হাদিস রয়েছে “জুমার দিনে গোসল করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজীব”।
তাই ইসলাম একজন প্রকৃত মু’মিনের জন্য কোন বাধ্য-বাধকতা ব্যতীত এক সপ্তাহের অধিক গোসল না করে থাকাকে কখনোই সমর্থন করে না। ইসলাম এড়্গেেত্র আরেকটু অগ্রসর হয়ে, বিশেষ-বিশেষ অবস’ায় গোসল করা ফরজ বলে নির্ধারণ করেছে। মু’মিন নারী-পুরম্নষ উভয়ের জন্য বিশেষ সময় গোসল করা অত্যাবশ্যক। অত্যাধিক সভ্য বলে পরিচিত পশ্চিমা কোন ব্যক্তি এই কথা বলতে পারে, গোসলতো একটি জরম্নরী বিষয়। একে ফরজ করার কিবা ভিত্তি আছে? কিন’ এই আপত্তির জবাব আজ নামধারী পশ্চিমা সভ্যতার লোকেরাই খন্ডন করেছে। সেখানকার অনেক উন্নত পরিবারে প্রতিদিন একবার গোসল করার অভ্যাস আছে। কিন’ সরকার কিংবা ধর্মীয় কোন স’ান থেকেই নিয়মিত গোসল করার ব্যাপারে কার্যকরী আদেশ ও ব্যবস’া না থাকার ফলে সেই দেশগুলোতে বসবাসকারী এমন অনেক গরীব ও অসহায় পরিবার আছে যারা নিজেদের আর্থিক দৈন্যদশার কারণে দিনে তো দূরের কথা, সপ্তাহে এমনকি মাসেও একবার গোসল করে না। কেননা সেখানে প্রচুর ঠান্ডা পড়ে যার ফলে গরম পানি করে গোসল করতে হয়। দু:খের সাথে বলতে হয়, তাদের সভ্যতা তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য ও লৌকিকতাকে তারা প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা উজ্জ্বল ও রঙ-বেরঙের জামা-কাপড় পরিধান করে, অত্যাধিক সাজ-সজ্জা ও আড়ম্বতা দেখিয়ে সন্ধ্যা বেলা বের হয়-তখন তাদের আধুনিক সভ্যতার এক আকর্ষণীয় মনোমুগ্ধকর চিত্র ফুটে উঠে। কিন’ যখন তাদের বাহ্যিক আড়ম্বরতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে এর গভীরে গিয়ে প্রবেশ করা হবে এবং তাদের অভ্যনত্মরীণ জীবনের দিকে দৃষ্টি দেয়া হবে তখন দুনিয়ার সম্মুখে তাদের অপরিচ্ছন্নতা, অন্ধকারময় এবং পূঁতিগন্ধে পূর্ণ এক জীবন চিত্র ভেসে উঠবে।
এরূপ এক ব্যক্তি যে প্রাকৃতিক কার্যাদি সম্পাদন করার পর পানির ব্যবহার না করে ডান হাত, বাম হাতের যথেচ্ছা ব্যবহার করে। সেভের কিঞ্চিৎ পানি বা নরম টিস্যু ব্যতীত তাঁর মুখে সপ্তাহে একবারও পানির স্পর্শ পড়ে না, দেহের অন্যান্য অংশও পানির স্পর্শ থেকে বঞ্চিত থাকে, সে তাঁর নখ ও বগলের নিম্নাংশের চুল কাটে না, খাবার খাওয়ার পর ব্রাশ বা কুলি না করার কারণে দাঁতে ময়লার সত্মর পড়ে মুখে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, প্রসাবের পর লিংগ পরিস্কার করার জন্য সামান্য টিস্যু ব্যবহার পর্যনত্ম অপ্রয়োজনীয় মনে করে-তাকে কি দুনিয়ার কোন চাকচিক্যময় সুন্দর পোষাক পবিত্র বানাতে পারে? হাজার ধরনের উজ্জ্বলতা কি তার অপবিত্রতাকে ঢেকে দিতে পারে? কখনোই নয়! সে ব্যক্তি কায়সার ও কিসরার মণি-মুক্তাযুক্ত অনিন্দ্য সুন্দর পোষাক পরিধান করে লন্ডন কিংবা প্যারিসের রাতকে যত সুন্দরই করম্নক না কেন, সে এক খন্ড সাধারণ কাপড় পরিহিত একজন মুসলমানের পাঁ বরাবরও পবিত্রতা লাভ করতে সড়্গম নয়। কেননা একজন মুমিন মুসলমান বান্দা কেবলমাত্র তাঁর প্রভুকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যেই দৈনিক পাঁচ-ছয়বার তাঁর হাত মুখ ধৌত করে থাকে। নোংরা, অপরিস্কার ও উদ্ভট জীবন যাপন করা কোন পূণ্য নয়। আমাদের সর্বোত্তম শিড়্গক বিশ্বনবী (সা.) দেহ পবিত্র ও পরিস্কার রাখার পাশাপাশি কাপড়-চোপড় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। চুলে তেল দিতে এবং চিরম্ননী করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সাঃ) বলেছেন, “আলস্নাহ্তায়ালা নিজে সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন।” অতএব একজন মু’মিনের দৃষ্টানত্ম এরূপ হতে হবে, সে সর্বদা পবিত্রতার উৎকৃষ্টমান নিজের মাঝে ধারণ করবে। তাই আমাদের রাসূল (সাঃ) এর এই পবিত্রবাণীর প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি দেয়া উচিত। হুজুর (সাঃ) লৌকিকতা এবং বাহ্যিক চাকচিক্যতাকে অপছন্দ করতেন। কিন’ তিনি অত্যনত্ম অনাড়ম্বর জীবন যাপন করা সত্ত্বেও তাঁর পোষাক-পরিচ্ছদ খুবই পরিস্কার থাকতো। জীর্ণ-শীর্ণ এবং তালি দেয়া কাপড় পরিধান করার পরও তাঁর কাপড়ের মাঝে কোন ধরণের ময়লা পাওয়া যেত না। তিনি সর্বদা হালাল এবং পবিত্র খাবার খেতেন কিন’ এড়্গেেত্র তিনি কখনো সীমালংঘন করেন নি। স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় উজ্বল ও পরিস্কার থাকতো তাঁর মোবারক দেহ ও কাপড়-চোপড় হুজুর (সাঃ)-এর পবিত্র হৃদয় সর্বদা যিকরে ইলাহীতে মশগুল ছিল। এ সকল অনন্য অসাধারণ কার্যাবলীর সন্নিবেশ রাসূলুলস্নাহ্ (সাঃ)-এর ঘামকে পর্যনত্ম সুরোভিত ও সুগন্ধময় করে দিয়েছিল। আমরা যদি রাসূল করিম (সাঃ)-এর আদর্শ মোতাবেক জীবন পরিচালিত করি তাহলেই আমরা অনেক রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে পারব এবং সমাজেও ফিরে আসবে শানিত্ম।

Likes(2)Dislikes(0)

Click Here to get update news always
প্রতি মুহুর্তের আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করন
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন