শিশুদের যত্ন

ঠান্ডা থেকে শিশুর যত্ন

শীতের শুরুতে শিশুদের চট করে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আবার বেশি ভারী কাপড়চোপড় পরালে ঘেমেও ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই দরকার সার্বক্ষণিক খেয়াল।

—হালকা কুসুম গরম পানিতে রোজই শিশুকে গোসল করাতে পারেন, এতে কোনো বাধা নেই। তবে গোসল করানোর পর একটা ভারী তোয়ালে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুড়ে নিন, দ্রুত পানি শুকিয়ে জামা পরিয়ে দিন। খোলা ঘরে গোসল না দিয়ে এ সময় বাথরুমে দরজা-জানালা আটকে গোসল দেওয়াই ভালো।

—রাতে ঘর যাতে বেশি ঠান্ডা হয়ে না যায় তা লক্ষ রাখুন। আস্তে পাখা ছেড়ে দিতে পারেন, কিন্তু গায়ে একটি হালকা চাদর বা কাঁথা দিন। ভোরে বা সন্ধ্যায় ফুলহাতা ভারী জামা, ফুলপ্যান্ট এমনকি মোজা পরালেও ঘুমানোর আগে হালকা সুতি জামা পরিয়ে দিন ও মোজা খুলে দিন। নইলে শিশু ঘুমের মধ্যে ঘেমে যাবে।

—শিশুদের ঠান্ডা পানি, বরফ, আইসক্রিম ইত্যাদি থেকে বিরত রাখাই ভালো।

—বাড়িতে কারও সর্দি-কাশি হলে ছোট শিশুদের তার কাছ থেকে দূরে রাখুন।

—ধুলাবালি, ঝুল-ময়লা, এমনকি ফুলের রেণু থেকেও শিশুদের অ্যালার্জিজনিত কাশি বা সর্দি হতে পারে। এসব থেকে দূরে রাখুন।

অধ্যাপক তাহমীনা বেগ

শিশু বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

                          গরমে শিশুর যত্ন

তাই শিশুর প্রতি বিশেষ যত্নবান হলে এসব সমস্যা সহজেই এড়ানো সম্ভব। গরমে শিশুদের সাধারণত যে সমস্যাগুলো বেশি হয়ে থাকে তা হচ্ছে জলবসন্ত, র্যাশ বা ফুসকুড়ি, পেট খারাপ, ত্বকের অসুখ, ঠাণ্ডার সমস্যা বা মামস।

জলবসন্ত বা চিকেন পক্স
এ সময়টায় শিশুদের জলবসন্ত হয়ে থাকে। এটা সাধারণত এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের বেশি হয়। তবে চিকেন পক্সের টিকা নেয়া থাকলে এ রোগটি হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে কমে যায়। এ অসুখের সময় শিশুর বিশেষ যত্ন নিতে হবে। তাকে নরম সুতি কাপড় পরাতে হবে। তরল বা গরম জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে। বেশি করে পানি খাওয়াতে হবে। এর সঙ্গে অবশ্যই মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে।

ত্বকের র্যাশ বা ফুসকুড়ি
শিশুদের ক্ষেত্রে এ সমস্যাটা বেশি দেখা যায়। এটা সাধারণত ঘামাচি বা চামড়ার ওপরে লাল দানার মতো ফুসকুড়ি হয়ে থাকে। এই র্যাশ বা ফুসকুড়ি চুলকানোর কারণে শিশুকে অবশ্যই পরিস্কার রাখতে হবে। নিয়মিত গোসল করিয়ে পরিস্কার জামা পরাতে হবে। ফুসকুড়ির জায়গাগুলোতে বেবি পাউডার লাগাতে পারেন। এতে চুলকানি কিছুটা কমে যাবে।

প্রতিবার কাপড় বদলানোর সময় শিশুকে নরম ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে পাউডার লাগিয়ে দিতে হবে। অনেক সময় ডায়াপারের কারণেও শিশুর ফুসকুড়ি হতে পারে। তাই খেয়াল রাখতে হবে, ভেজা ডায়াপার যেন শিশুর গায়ে বেশিক্ষণ না থাকে। ডায়াপার নষ্ট হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে নতুন ডায়াপার পরিয়ে দিন। তবে গরমের সময় বেশিক্ষণ ডায়াপার না পরিয়ে রাখাই ভালো। অনেক সময় র্যাশ বেশি হয়ে গেলে ঘা হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

পেট খারাপ
গরমের সময় সাধারণত বেশি হয়ে থাকে পেট খারাপ। শিশুর পেট খারাপ হলে তাকে ঘন ঘন স্যালাইন খাওয়াতে হবে। সেইসঙ্গে পানি অথবা ডাবের পানি খাওয়াতে হবে। একই সঙ্গে তাকে তরল খাবারও দিতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত শিশুর পায়খানা স্বাভাবিক না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন শিশুর পানিশূন্যতা না হয় এবং তার প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে। এছাড়া শিশুর পায়খানার সঙ্গে যদি রক্ত যায় তবে অবহেলা না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ছয় মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ সময় কোনো অবস্থাতেই মায়ের দুধ বন্ধ করা যাবে না। সেইসঙ্গে পানি ও অন্যান্য খাবারও দিতে হবে।

ঠাণ্ডার সমস্যা
গরমে শিশুদের ক্ষেত্রে ঠাণ্ডার সমস্যাটাও বেশি হতে দেখা যায়। গরমে অতিরিক্ত ঘামের ফলে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। তাই শিশু ঘেমে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর মুছে দিয়ে কাপড় বদলে দিতে হবে। গরমে শিশুকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে এবং তাকে সব সময় পরিস্কার কাপড় পরাতে হবে। এ সময় ঠাণ্ডা লেগে শিশুর মামস হতে পারে। মামস অনেক সময় অল্প দিনে সেরে যায়। কিন্তু বেশি দিন গড়ালে শিশুকে এমএমআর ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞের পরামর্শমত ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিতে হবে চুলের যত্ন
এই গরমে আদরের ছোট্ট মণির চুলের দিকেও নজর দিতে হবে। গরমে চুলের গোড়া ঘেমে যায়, সঙ্গে ধুলাবালির আক্রমণ তো রয়েছেই। তাই রোগ প্রতিরোধে প্রথমেই শিশুদের চুলের বিশেষ যত্ন নিতে হবে। অনেক সময় অতিরিক্ত গরমে চুলের ত্বকে খুশকি বা ঘামাচি বের হয়। তাই গরমের শুরুতেই চুল ছেঁটে ছোট করে দিতে হবে। এতে চুলের গোড়া ঘামওে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।

এক বছর বা তার কম বয়সে শিশুদের গরমের সময় মাথা অবশ্যই ন্যাড়া করে দিতে হবে। আর চুল একান্তই লম্বা রাখতে চাইলে তার প্রতি আরও একটু যত্নশীল হন। গোসল করার পর চুল ভালোভাবে মুছে নিন। বড় ফাঁকওয়ালা চিরুনি দিয়ে চুলটা ঠিকভাবে আঁচড়ে দিন। এরপর চুল শুকিয়ে গেলে ভালোভাবে বেঁধে দিন। শিশুর চুলে তাদের উপযোগী ও ভালো মানের শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা চিরুনি ব্যবহার করা উচিত। সপ্তাহে দুই দিন চুলে শ্যাম্পু করা ভালো।

লেখক : ডা. মো. আবু তৈয়ব, নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ; ঢাকা শিশু হাসপাতাল

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

       আবহাওয়া পরিবর্তনে শিশুর যত্ন

রুমা ইসলাম

হঠাৎ বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম, কখনও ঠান্ডা বাতাস- আবহাওয়ার এ যখন-তখন পরিবর্তনকে ছোট-বড় কেউই সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে ছোটরা তো নয়ই। তাই বরষাকালে ছোটদের অসুখে ভুগতে দেখা যায় বেশি। এ সম্পর্কে ইউনাইটেড হাসপাতালের কনসালটেন্ট (নবজাতক ও শিশুরোগবিষয়ক) ডা. নার্গিস আরা বেগম বলেন, বরষার শুরুতেই নানা ধরনের অসুখ-বিসুখের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হয় বেশি। এ সময় শিশুদের জন্য বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। এ সময় বড়দের সামান্য অসচেতনতা হয়ে উঠতে পারে বড় সমস্যার কারণ। এ সময় ছোট শিশুদের ভাইরাস জ্বর, সর্দি, কাশি, হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও জন্ডিসে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। গত কয়েক বছরে বর্ষাকালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো। এক্কেবারে ছোট্ট শিশুরা তো নিজেদের কথা বলতে পারে না, তাই মাকে খেয়াল রাখতে হবে শিশুর গরমে অস্থির লাগছে কিনা। শিশু ঘেমে ভিজে উঠলে তাকে পাতলা সুতি কাপড় পরাতে হবে। বেশি করে বিশুদ্ধ পানি পান করানো ও গা-হাত-পা মুছে আলো বাতাসযুক্ত সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে স্যালাইন পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করা ভালো। শিশুর সর্দি-জ্বর হলে লেবুর চা বার বার খাওয়ানো ভালো। এতে ‘সি’ ভিটামিনের অভাব পূরণ হয়ে শিশু দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।

বরষাকালে হঠাৎ ঠান্ডায় কখনও কখনও শিশুদের জ্বরের সঙ্গে গলাব্যথা দেখা দেয়। গলাব্যথা দু’তিনদিন থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। গলাব্যথা বা টনসিল আক্রান্ত শিশুদের কখনোই ফ্রিজের ঠান্ডা পানি, ঠান্ডা খাবার, আইসক্রিম, জুস খেতে দেয়া উচিত নয়। এ ছাড়া বরষাকালে শিশুদের সর্দি-জ্বরের সঙ্গে চোখের ওপরের অংশ ফুলে যায়, নাক বন্ধ হয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনেক সময় সর্দি ঘন হয়ে হলুদ হয়ে যায়, যা সাইনোসাইটিসের লক্ষণ। তাই বরষাকালে বাইরে বেরোনোর সময় অবশ্যই ছাতা বা রেইনকোট ব্যবহার করুন। প্রয়োজন ছাড়া শিশু যাতে বাইরে না যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত। অন্যদিকে দেখা যায়, গলাব্যথা দু-তিন দিনের বেশি থাকে আর এ কারণে শিশুদের টনসিলাইটিস হয়, যা হচ্ছে টনসিল গ্লান্ডের প্রদাহ। এর সঙ্গে শুকনো কাশিও থাকতে পারে। এ কাশির জন্য রাতে ঘুম ভেঙে যায়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুর টনসিলাইটিসের সঙ্গে ক্যারিনিটিসও হয়েছে। তার মানে টনসিলের আশপাশের জায়গাতেও ইনফেকশন হয়েছে। আর যদি শিশু ঠান্ডা কিছু খায়, এতে গলা বসে যায়, কণ্ঠ শুনতে কর্কশ লাগে- এটাকে ল্যারিংজাইটিস বলা হয়। এ সময় শিশুকে কম কথা বলতে দিতে হবে। দরকার মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে। মাঝে-মধ্যে শিশুদের ঠান্ডা লেগে নাকের পেছনে অফবহড়রফ মষধহফ বড় হয়েও নাক বন্ধ এবং সর্দি হতে পারে, তাই ডাক্তারের পারামর্শ অনুযায়ী ঠিক মতো পরীক্ষা অর্থাৎ এক্স-রে করিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। ভ্যাপসা গরমে শিশু-কিশোররা অ্যালার্জিজনিত অসুখেও আক্রান্ত হয়। বৃষ্টির পানি গায়ে পড়লেই ঘন ঘন হাঁচি দেয় এবং নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে। এ রোগকে অ্যালার্জিক রিরিটিস বলা হয়। এটা খুবই কষ্টকর। কেননা শিশুদের সারাক্ষণ নাক পরিষ্কার করতে হয় এবং নাকে মাঝে-মধ্যে ঘা দেখা দেয়। তাই ঘরে তৈরি নরমাল স্যালাইন পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলে উপকার পাওয়া যায়। আবার এর জন্য অ্যান্টিহিস্টাসিন সিরাপ ও নাকের স্প্রে ব্যবহার করলেই এরা বেশ ভালো থাকে। কখনও কখনও অতিরিক্ত গরম ও ঘামের জন্য কানের ভেতর চুলকানি হয়, তখন অপরিষ্কার জিনিস দিয়ে কান চুলকালেই কানে ফোঁড়া হতে পারে। কানে যদি ফোঁড়া হয় এবং সেটা ফেটে পুঁজ বের হয়, তাহলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরিষ্কার করিয়ে ওষুধ খাওয়াতে হবে। আবার কোনো শিশুর যদি আগে থেকে কান পাকা রোগ থাকে, বরষাকালে অনেক সময় সেটা বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং বৃষ্টিতে ভেজা থেকে মাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তার শিশুর কানে কোনো অবস্থাতেই পানি না ঢোকে। মা যদি অসতর্ক থাকেন তাহলে এই কান পেকে শিশু শ্রবণশক্তি হারিয়ে বধির হয়ে যেতে পারে। আবার ভ্যাপসা গরমের জন্য কানের ভেতর ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে। এই আবহাওয়ায় ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে। এই ফাঙ্গাল ইনফেকশন খুব সহজেই ছড়ায়। কানে তখন চুলকানি হয়। শিশুরা নখ, চুলের ক্লিপ, কাঠি বা পুরনো কটনবাড দিয়ে কান চুলকানোর চেষ্টা করে। অথবা মা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে কান পরিষ্কার করার কারণে কান ব্যথা হয়ে পানি ঝরে। এটাকে অটোমাইকোসিস বলে। শিশুকে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে নিয়ে কান পরিষ্কার করাতে হবে ও ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। মায়েদের মনে রাখতে হবে, শিশু যদি কানে ব্যথার কথা বলে তারা যেন কানে সরিষার তেল না দেন। এতে কানের প্রদাহ বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ম্যালেরিয়া রোগের বেশ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সেখানকার মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া জ্বর হচ্ছে- সুতরাং মশা যাতে আক্রমণ না করে সেজন্য মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে। প্রয়োজনে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করতে হবে। ভ্যাপসা গরমে খাবারদাবার খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, তাই যতটা সম্ভব খাবার-দাবার বাসি করবেন না। শিশুদের ফ্রেশ খাবার খাওয়াবেন। মনে রাখবেন, যে কোনো রোগের প্রতিষেধকের চেয়ে রোগ হওয়ার আগে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা উচিত।

সামগ্রিকভাবে বরষাকালে সারাদেশের শিশুদের জন্য বলছি- এ সময়ে শিশুদের খাবারের ব্যাপারেও যত্নশীল হতে হবে। এ সময় যথেষ্ট পুষ্টির জন্য ডিম, কলা, সবজি-খিচুড়ি, বিভিন্ন ধরনের ফরমালিনমুক্ত মাছ দেয়া যেতে পারে। প্রচুর টাটকা ও সুস্বাদু দেশি ফল যেমন- পেয়ারা, জাম, জামরুল, আনারস, আম, আমড়া ইত্যাদি খাওয়ানো উচিত। এসব ফল পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। এসব মৌসুমি ফল শিশুর ভিটামিন সি-র চাহিদা পূরণ করে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। খেয়াল করে প্রতিদিন অন্তত একটি ফল শিশুর খাদ্য তালিকায় রাখা প্রয়োজন। যেসব শিশু ফল খেতে পারে না বা চায় না, তাদের জুস করে দেয়া যায়। ছয় থেকে এক/দুই বছর পর্যন্ত শিশুদের পর্যাপ্ত পরিমাণ মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে এবং সঙ্গে ঘরের তৈরি মৌসুমি শাকসবজি, ভাত-মাছও খাওয়াবেন। এতে শিশু সুস্থ থাকবে, সহজে অসুস্থ হবে না। অতি গরমে গায়ে ফোস্কা ও রেস উঠতে পারে। তাই সুতির জামা-কাপড় পরাবেন বাচ্চাকে। তা হলে হিটরেস তাকে আক্রান্ত করবে না। শিশুকে যাই খাওয়ান না কেন অবশ্যই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করাতে হবে। তা না হলে শিশু পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আর খাবার খাওয়াতে হবে অবশ্যই ধৈর্যের সঙ্গে। যেসব শিশু বুকের দুধ পান করে সেসব মায়েরও ঠান্ডা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ মা আক্রান্ত হলে শিশুও একই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বরষাকালে খেয়াল রাখতে হবে চারপাশ যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। সেঁতসেঁতে পরিবেশ রোগ-জীবাণু ছড়ায় তাড়াতাড়ি। সুতরাং শিশুকে সর্বোত্তমভাবে সুস্থ-সুন্দর রাখতে ঘর-বাড়ি আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ও যতটা সম্ভব শিশুর প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া বাঞ্ছনীয়।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

            পুষ্টিহীন মা ও শিশুদের যত্ন

 

শিশুরা আগামী দিনে যোগ্য নাগরিক হয়ে রাষ্ট্রের উন্নতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাই সুখী-সমৃদ্ধ আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য শিশুদের সুস্থ হয়ে বেড়ে ওঠার গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক বিশ্বে বিষয়টির ওপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

শিশুর সুস্থতার পূর্বশর্ত মায়ের সুস্বাস্থ্য। মা সুস্থ না থাকলে সুস্থ শিশু জন্মলাভ অসম্ভব। তাই একটি সুস্থ শিশু লাভ করতে হলে গর্ভাবস্থা থেকে মায়ের যত্ন নিতে হবে। গর্ভবতী মায়ের যত্ন পরোক্ষভাবে শিশুরও যত্ন। মায়ের যত্নের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের উপর।

দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি নারী অপুষ্টির শিকার। অন্যদিকে ৫ বছর বয়সী মোট ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুর মধ্যে অপুষ্টির শিকার ১ কোটি ৮০ হাজার। দেশের মোট নারীর অর্ধেক ও মোট শিশুর ৪২ শতাংশই ভয়াবহ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সরকারি ও বেসরকারি (দেশি ও আন্তর্জাতিক) সংস্থাগুলোর সর্বশেষ গবেষণা ও জরিপে বাংলাদেশের নারী ও শিশু পুষ্টির এ চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম মওলা বলেন, অপুষ্টি নারীর কর্মদক্ষতা কমায়। এতে তার উৎপাদনশীলতা কমে ও জাতীয় আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে একজন অপুষ্ট মা অপুষ্ট সন্তানের জন্ম দেয়। সেই অপুষ্ট সন্তানটি মেয়ে হলে সে আবার অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়। অপুষ্ট মা ও সন্তানের বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসার পেছনে খরচ বাড়তেই থাকে। এভাবে অপুষ্টি চক্র চলতেই থাকে ও জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়।

বাংলাদেশে কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) ‘বাংলাদেশের নারী ও শিশু স্বাস্থ্য-২০১১’ গবেষণায় বলেছে, পুষ্টিহীনতার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়স হয়নি এমন প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

তবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) বলছে, দেশে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা অনেক। পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪২ শতাংশ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। মায়েদের এক-তৃতীয়াংশ অপুষ্টির শিকার। তাদের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম। এছাড়া ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মা এবং ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের ৮০ শতাংশ রক্তশূন্যতায় ভুগছে।

তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ ‘পুষ্টি জরিপ-২০১১’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষেত্রে পুষ্টিহীনতায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ৫০ শতাংশের বেশি নারী পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পুষ্টিহীনতার কারণে ৫৪ শতাংশ অর্থাত্ ৯৫ লাখ শিশুর বৃদ্ধি থেমে রয়েছে।

দেশের সামগ্রিক এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে গর্ভবতী মাকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব দিতে হবে। গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম এবং বিশ্রাম নিতে হবে। তাই পরিবারের সবাইকে এ ব্যাপারে গর্ভবতী মাকে সাহায্য করা উচিত।

গর্ভাবস্থা মা যা আহার গ্রহণ করেন, তাই শিশুর বিকাশে সহায়ক হয়। তাই গর্ভবতী মায়ের নিজের প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণের পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর জন্যে বাড়তি খাদ্যের প্রয়োজন।

মায়ের অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ শুধু তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর নয়, গর্ভস্থ শিশুর ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গর্ভাবস্থায় মা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করার কারণে শিশু ও গর্ভবতী মা উভয়ই অপুষ্টিতে ভোগেন। তাই গর্ভবতী মা ও তার অনাগত শিশুর সুস্থ জীবনের জন্য গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা।

মা যদি গর্ভাবস্থায় অপুষ্টিতে ভোগেন তাহলে যে শিশু জন্মগ্রহণ করবে তার জন্ম-ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হবে, শিশু জন্মগতভাবেই অপুষ্টি শিকার হবে। এ ধরনের শিশুর মৃত্যু ঝুঁকিও বেশি থাকে। অন্যদিকে গর্ভকালীন সময়ে মা যদি পুষ্টিকর খাদ্য না খান, তাহলে মায়ের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়বে। এ ধরনের মায়েদের মৃতশিশু প্রসব এবং প্রসবকালীন মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি থাকে।

গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রতিদিন ভাতের সাথে মলা ও ঢেলা মাছ এবং সম্ভব হলে মাংস, দুধ ও ঘন ডাল, সিমের বীচি ইত্যাদি খাবার তালিকায় রাখতে হবে!

এ ছাড়া সবুজ ও হলুদ রঙের শাকসবজি ও তাজা ফলফুল বিশেষ করে পাকা আম, পেঁপে, কাঁঠাল, পেয়ারা, আনারস, কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা শাক, লালশাক, গাজর, টমেটো , মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে দিতে হবে।

ভিটামিন ‘এ’ শরীরে আয়রন উৎপাদনে সাহায়তা করে! একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য আয়রণ খুব জরুরী।

আমলকী, কামরাঙ্গা, কুল ও লেবু জাতীয় ফল সহজেই ভিটামিন ‘সি’- এর অভাব পুরণ হয়। আয়রন শোষিত হওয়ার জন্য ভিটামিন ‘সি’ জরুরী!

গর্ভবতী মায়েদের জন্য ক্যালসিয়ামও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে! ক্যালসিয়ামের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লামসিয়া হবার সম্ভাবনা থাকে। দুধ, ঘি, মাখন, ডিমের কুসুম, ছোট মাছ, কলিজা, ডাল, মাংস এবং সবুজ শাক সবজি ও ফলমূল ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে এ ধরনের খাবার যোগাড় করতে অসমর্থ হলে স্বাভাবিক পরিমাণের বেশি ভাত, ঘন ডাল, তরকারী এবং ফলমূল খেলেই গর্ভবতী মায়েদের চাহিদামাফিক পুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়।

পু্িষ্টবিজ্ঞানীদের মতে, গর্ভবতী মায়েদের খাদ্য তালিকায় আয়োডিন যুক্ত লবণ ও সামুদ্রিক মাছ এবং সামুদ্রিক মাছের তেল থাকা খুবই প্রয়োজন।

গর্ভবতী মায়েদের যত্ন, খাদ্যগ্রহণ ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ফলে আমরা একটি সুস্থ্য-সবল শিশু লাভ করতে পারি। সুস্থ্য শিশু জন্মগ্রহণের পর তাকে ঠিকমতো বেড়ে ওাঠার জন্য বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। যেমন শিশু জন্মের পর পরই শিশুকে চিনি বা মধুমিশ্রিত পানি পান না করিয়ে মায়ের শাল দুধ পান করাতে হবে। মায়ের এই শাল দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ লুকিয়ে আছে। একটি শিশু জন্মের টানা দু’বছর তার মায়ের দুধ পান করতে হয়। পরিবত্র কোরআন শরীফের সুরা বাকারার এ বিষয়ে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

প্রতিটি মা-বাবার মধ্যেই সর্বজনীন স্নেহ-ভালোবাসা থাকে তাদের শিশুর জন্য। তারা প্রত্যেকেই চান তাদের সন্তান যেন সুস্থ্য-সবল হয়ে বেড়ে ওঠে। তাদের এই চাওয়ার মধ্যে কোন কার্পণ্য না থাকলেও কীভাবে একটি শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে সে বিষয়ে অনেকেরই ধারণা নেই।

বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগে প্রচলিত অনেক ধারণাই আজ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অতএব সেসব জানতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে শিশুর যত্ন করতে হবে, যাতে সে সুস্থ্য-সবল হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিটি শিশুই আমাদের সোনালী ভবিষ্যতের কান্ডারি। আমরা কোনভাবেই তাদেরকে অগ্রাহ্য করলে জাতি হিসাবে আমরা পেছনে পরে থাকবো।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

                         ৩-৬ বছরের শিশুদের যত্ন

সবাই বলে তিন থেকে ছয় বছরে বাচ্চার মূল মানসিক প্রথম ধাপ তৈরি হয়। ছোট্ট সোনামনিরা তাদের শৈশবে পা দেয় দুলু দুলু পদক্ষেপে। তাদের কল্পনা শক্তি প্রখর, আছে নানা বিষয় নিয়ে ভয় ভীতিও। কিন্তু দৌড় ঝাপ দিয়ে খেলায় তাদের নেই আপত্তি। এই সময়টাই তাদের সামাজিক পরিচিতি লাভের সময়। নিজের আপন জনের গণ্ডি পেরিয়ে মিশতে শেখে সবার সাথে। নতুন নতুন কাজ করার ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে ওঠে। প্রতিটি শিশুই আলাদা। একেক জনের মেধা, মন, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় একেক গতিতে। বড় হওয়ার পরে তারা অনেক কিছু সুন্দর ভাবে বুঝতে পারে ঠিকই। কিন্তু কথায় বলে বাঁশ কচি থাকতে বাঁকানো সহজ। শৈশবের গড়ে ওঠা সুন্দর অভ্যাস সারা জীবনের পাথেয়।

সামাজিক ও মানসিক বিকাশঃ

৩ ও ৪ বছর –

– এ সময় প্রথম তারা বুঝতে পারে যে মা, বাবা, ভাই, বোন ছাড়াও আরও অনেকের সাথেই কথা বলতে হয়। শুরু হয় সামাজিকতার প্রথম ধাপ। তাদের অভ্যন্তরীণ পৃথিবীটা অনেক শক্তিশালী। তারা ভান  করা আর আসল কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ডাইনিরা কি সত্যি জাদু করে অথবা শিশুরা কি বড় হলে পাখির মত ডানা হয়ে আকাশে উড়ে যাবে তা তারা বুঝতে পারে না। এই বয়সে বাচ্চারা মিথ্যে বলে না। কিন্তু তারা প্রায়ই গল্প ও বাস্তব কে মিশিয়ে ফেলে।

– ৩ বছর থেকে তারা বুঝতে পারে যে তাদের মন তাদের বাবা মা থেকে আলাদা এবং তারা তার মন পড়তে পারে না।

– বড় ছোট, লম্বা খাটোর মানে বোঝে। কিন্তু এগুলো কে আলাদা করতে পারে না। একটি লম্বা পাতলা গ্লাস থেকে একটি ছোট মোটা গ্লাস যে বেশি ধারন করতে পারে তা বুঝতে পারে না।

– রাতের পর দিন আসে, কার বয়স কত এগুলো বুঝতে শেখে।

– এ বয়সে সে ছবি আঁকা শেখে। যার বেশির ভাগই হয় বড় গোল মাথাওয়ালা, চোখের নিচ থেকেই লম্বা লম্বা পা। ক্রস ও স্কয়ার আঁকা শেখে। তিন ইট দিয়ে ব্রিজ বানাতে পারে।

৫ ও ৬ বছরঃ

– বন্ধুত্বের মানে প্রথম বুঝতে পারে। সঙ্গীদের নিয়ে মাঠে, বাগানে খেলতে চায়।

– মা কে ছোট ছোট কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করে। খেলনার প্রতি আগ্রহ কমে সেখানে দখল করে জীবন্ত জিনিসের প্রতি আগ্রহ। পোষা বিড়াল বা কুকুরের জন্যে অনেক সময় ব্যয় করে।

– প্রথম হাতে খড়ির সময়। অক্ষর গুলোকে বুঝতে শেখে। একটি বাচ্চা অক্ষর শেখার ৩ মাসের মধ্যে শব্দ লিখতে শেখে।

– ছোট ছোট নৌকা, প্লেন, কাগজের অন্যান্য জিনিস বানাতে শেখে এবং নিজে নিজে করতে চায়।

খাদ্যের তালিকাঃ

-বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী কম বেশি করে নিতে হবে। কিন্তু সঠিক পুষ্টির জন্যে সুষম এই খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলে ভালো।

খাদ্যের তালিকাঃ

chart 2

যা যা করা যাবে নাঃ

– শিশুরা আদরের জন্যে, এটা মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, তাদের কে সঠিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হলে তাদের অপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা যাবে না।

– অনেকেই সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। তাদের ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর দেয়াও যে জরুরী হতে পারে তা বোঝেন না।

– ভূত প্রেতের ভয় দেখিয়ে যেমন – এটা না করলে শাঁকচুন্নি এসে কামড় দেবে বা গাছের নীচ দিয়ে গেলে ভূত ডিম পেড়ে দেবে মাথায় এসব ধারনা কখনই দেয়া যাবে না। জীবনের অনেক প্রতিকূলতায় যাতে সে শক্ত ভাবে দাঁড়াতে পারে সেই শিক্ষা দিন। প্রথমেই ভীতিকর চিন্তা মাথায় দিয়ে দিলে বাচ্চা বড় হয়েও অনেক ব্যাপারে বাঁধার শিকার হবে।

– বাচ্চারা মাঝে মাঝেই অনেক অযৌক্তিক, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে পারে। তাতে বিরক্ত হয়ে অথবা হাসাহাসি করে উড়িয়ে না দিয়ে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলুন।

– সন্তানের গায়ে কম বেশি সব মায়েরাই হাত তুলে থাকেন। শাসন করা অবশ্যই জরুরী, কিন্তু তা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। কথায় কথায় না মেরে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বলুন। সন্তানকে বোঝান যে আপনি তাকে কত ভালোবাসেন। এতে আপনারই লাভ হবে। বাচ্চা তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আপনার মতামতকে গুরুত্ব দেবে। তার জীবনে আপনাকে এক অপরিহার্য অংশ মনে করবে।

– কখনই জোর করে কিছু করতে বাধ্য করবেন না। সন্তান আপনারই অংশ। তাকে নিজের অংশ মনে করুন। নিজের উচ্চাশা তার উপর দিয়ে চালিয়ে দেবেন না।

– আজে বাজে জিনিসের অভ্যাস না করে, সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস করুন। বাচ্চারা এমনিতেও খেতে চায় না। জোর করে না খাইয়ে অল্প অল্প করে অনেক বার ধৈর্য ধরে খাওয়ান।

– বাবা-মার ঝগড়া, বিচ্ছেদ সন্তানের মন মানসিকতাকে নষ্ট করে। তাই মিলে মিশে সন্তান পালন করুন, একে অন্যের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। আপনাদের ভালোবাসা তাদেরকেও ভালোবাসতে শেখাবে।

যে সব ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ অতি জরুরীঃ

– বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে তারা ঠিক মত বেড়ে উঠছে কিনা। বয়স অনুযায়ী একটি মেয়ে বাচ্চা ও ছেলে বাচ্চার উচ্চতা ও ওজনের চার্ট একজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে দেখে নিতে হবে। সঠিক সময়ে অন্যান্য বাচ্চাদের অনুপাতে তার বেড়ে ওঠা হচ্ছে কিনা দেখতে হবে।

– পূর্বের থেকে বর্তমানে কোন কাজ করতে অধিক সময় লাগলে গুরুত্বের সাথে নিন। এই সমস্যায় সে প্রতিনিয়ত পড়ছে কিনা খেয়াল রাখুন।

– অনেক সময় অতি অপুষ্টিতে প্রোটিনের অভাবে বাচ্চার শরীরে পানি জমে ফুলে যায়। রক্তশূন্যতা থাকলে, ঘন ঘন বমি করলে বা মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

– কোনো কোনো বাচ্চার জন্মগত শারীরিক ত্রুটি থাকে। এগুলোকে হেলাফেলা না করে ডাক্তারকে বলুন। অল্প বয়সে চিকিৎসায় অনেক রোগই সেরে যায়। বয়স বাড়ার অপেক্ষায় থাকবেন না ।

– প্রত্যেক বাবা মাই সন্তানকে ভালবাসেন। তাহলে সেই আদরের সন্তানের যত্নও হওয়া চাই সেরকম ভাবেই। তাই নিজে সুস্থ থাকুন , আদরের সোনামনিকেও ভরে দিন ভালবাসায়।

লিখেছেনঃ শারমিন আখতার চৌধুরী

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

                        শীতের শুরুতে শিশুর যত্ন

শীতের শুরুতে শিশুর যত্ন

শীতের আগমনে শিশুর যত্ন নিয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। খুসখুসে কাশির সাথে বারবার নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, শরীরের তাপমাত্রা কখনো কখনো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়া, হাত ও পায়ের চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া কিংবা চামড়ার মধ্যে ফুসকুড়িও দেখা যায়। এসব সমস্যা নিয়ে বারডেম হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান তাহমিনা বেগম কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শীতের শুরুতে শিশুদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সর্দি-কাশি। এ সময় হালকা উষ্ণ পানি দিয়ে শিশুদের গোসল করাতে পরামর্শ দেন। হালকা ফ্যান ছেড়ে ঘুমালেও কোনো ক্ষতি নেই। নাক যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে লবণ পানির ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাজারে নরসল ড্রপ কিনতে পাওয়া যায়। পাতলা কাপড় বা কটন বাডে দুই ফোঁটা নরসল ড্রপ লাগিয়ে নাক পরিষ্কার করা যেতে পারে। যদি কাশি হয়, তবে ওষুধ ব্যবহার না করে ঘরেই প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। যেমন-আধা কাপ লাল চায়ের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খাওয়ানো যায়। অথবা আধা কাপ গরম পানির সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস ও মধু বা তুলসী পাতার রস ও মধু মিশিয়ে খাওয়ানো যায়। আদা কুচি করে বা আদা চায়ের সঙ্গে মধু মিশিয়েও শিশুকে খাওয়ানো যেতে পারে। জ্বর ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়ানো উচিত। এ ছাড়া তোয়ালে ভিজিয়ে বারবার শিশুর গা মুছিয়ে দিতে হবে। তবে বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছে কি না সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এ জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশুর ত্বকের যত্ন প্রসঙ্গে বলেন, শীতের সময় শিশুকে প্রতিদিন সামান্য গরম পানি দিয়ে গোসল করালে ভালো হয়। গোসলের আগে সরিষার তেল ব্যবহার না করে জলপাই তেল ব্যবহার করাই ভালো। গোসলের পর বেবি লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সাবান এবং এক দিন শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে।

শিশুকে প্রতিদিন গোসল করানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অনেকে নবজাতককে নিয়মিত গোসল করান না। ফলে বাচ্চার গায়ে ফুসকুড়ি ওঠে এবং এর মধ্যে পুঁজ জমে যায়। জন্মের পর নবজাতককে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত গোসল না করানো উচিত। এরপর প্রতিদিন গোসল করানো যেতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে গ্লিসারিনের সঙ্গে পানি মিশিয়ে শিশুর হাত-পায়ে লাগানো যেতে পারে।

শীতের শুরুতে বাচ্চাদের খুব গরম কাপড় পরানোর দরকার নেই। শিশুদের মোটা সুতি কাপড় পরানো যেতে পারে। আঁটসাঁট বা উলের কাপড় পরালে শিশুর শরীর ঘেমে ঘামাচি উঠতে পারে। তবে শিশুদের ফ্লানেলের জামা পরানো যেতে পারে। রাতে গলায় ও মাথায় পাতলা কাপড় পেঁচিয়ে রাখলে ভালো হয়। তাহলে ঠান্ডা লাগার ভয় অনেকাংশেই কমে যাবে। তবে টুপি বা মোজা পরে শিশুকে কখনোই ঘুমাতে দেওয়া উচিত নয়।

 

Likes(3)Dislikes(1)

Click Here to get update news always
প্রতি মুহুর্তের আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করন
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন