শিক্ষা

শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‍’শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum থেকে। যার অর্থ to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা। সক্রেটিসের ভাষায় ‘শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।’ ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা’- এরিস্টটল । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।

শব্দের উৎপত্তি

শিক্ষা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত “সাস” ধাতু থেকে। সাধারণভাবে বলা যায় মানুষের আচরণের কাঙ্খিত, বাঞ্চিত এবং ইতিবাচক পরির্বতনই হলো শিক্ষা। যুগে যুগে নানা মনীষী নানাভাবে শিক্ষাকে সজ্ঞায়িত করেছেন। আবার সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার সজ্ঞা বা ধারণাও পরির্বতন এসেছে।

শিক্ষার ধরন

শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত শেখে। তাই শিক্ষার লাভের ধরন বিভিন্ন। শিক্ষার ধরন ৩টি

  • আনুষ্ঠানিক শিক্ষা : আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধারাবাহিক এবং ক্রম উচ্চস্তরে বিন্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে বোঝানো হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। শিক্ষার্থী একটি বয়সে আনুষ্ঠানিক উপায়ে শিক্ষা অর্জন শুরু করে এবং ধারাবাহিকভাবে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে।
  • অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা : (Informal Education) শিক্ষার একটি উল্লেখ্যযোগ্য ধরন। মানুষ তার জন্মের পর থেকে এ নানাভাবে শিখছে। এই শিক্ষা তার সমাজের কাছ থেকে হচ্ছে, পরিবারের কাছ থেকে হচ্ছে, আবার গুরুজনের বা বিশিষ্ট-অবিশিষ্ট ব্যক্তি বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমেও হচ্ছে। আবার প্রকৃতি কাছ থেকেও মানুষ শিখছে। প্রতিনিয়ত তার শেখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে শেখে । এই যে অনির্দিষ্ট নান উপায়ে মানুষ শিখছে এটাই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা। অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাই আমাদের শেখার বা আচার-আচরণের অনেক বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেয়। জন্মের পর একটি শিশু কীভাবে কথা বলতে হবে তাকে আলাদা করে শেখাতে হয় না, সে নিজে নিজে তার পরিবারের সবাইকে দেখেই শেখে। এইভাবেই সূচনা হয় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার। প্রাচীন সমাজে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল শিক্ষা লাভের একমাত্র উপায় এবং এ শিক্ষা ছিল সর্বজনীন। বাঁচার জন্য এবং বাঁচার মধ্যে দিয়ে এ শিক্ষা অর্জিত হতো। তখন সামাজিকীকরণ ও শিক্ষার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না। আধূনিক সমাজে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আধিপত্য সত্ত্বেও পারিবারিক শিক্ষাই এখনো শিশুর মানসিক বিকাশ ও চরিত্র গঠনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।এই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে বোঝাতেই রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-“বিশ্বজোড়া পাঠাশালা মোরসবার আমি ছাত্র,নানাভাবে নতুন জিনিসশিখছি দিবারাত্রি”
  • উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা : 

    উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা শিক্ষার একটি ধরন। মূলত উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক পেক্ষাপটের আলোকে এই ধারার উৎপত্তি। সাধারণত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পদ্ধতি বা প্রতিষ্ঠানের বাইরে, সুনির্দিষ্ট জনগোষ্টির জন্য, বিশেষ উদ্দেশ্যে সংঠিত এবং বিশেষ শিখন চাহিদা পূরণের জন্য, আলাদাভাবে বা সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিচালিত শিক্ষামূলক কার্যক্রমই হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা (non formal education)।

    উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারণা নতুন নয়। উন্নয়শীল দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে (drop out) বা কোন না কোন কারণে প্রাথমিক শিক্ষাচক্র (primary education cycle) সমাপ্ত করার আগেই স্কুল থেকে ঝরে পরে। ফলে এইসব দেশে এইভাবে নিরক্ষর জনগণের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তাই তাদের মানে এইসব দেশের বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত অসুবিধাগ্রস্থ (disadvantaged) ছেলে-মেয়ে, কিশোর-কিশোরী এবং বয়স্ক লোকদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ (second chance of education) প্রদান করা যায়। তাই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ দানকারী কার্যক্রমও বলা হয়।

    আবার উন্নয়শীল দেশসমূহে দেখা যায় সকারের একার পক্ষে সকল শ্রেণির সকল মানুষের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। তাই সেইসব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সহায়ক/সম্পূরক ও পরিপূরক (supplementary and complementary) হিসেবেও কাজ করে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে কখনই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে না।

    উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার উল্লেখ্যযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য

  •  এটি একটি সুশৃঙ্খল নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত উন্মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
  •  শিক্ষাক্রম নির্দিষ্ট নয়, আর থাকলেও শিথিলযোগ্য
  •  ডিগ্রীমুখী বা সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষা নয়
  •  এটি স্থানীয় নুযোগ সুবিধা ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম
  •  শিক্ষার্থীদের চাহিদা অন্যসারে বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়
  • ব্যবহারিক দিকগুলোর প্রতি বেশী লক্ষ রাখা হয়
  •  আলাদাভাবে পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যবস্থা নেই তবে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা আছে।
Likes(0)Dislikes(0)

Click Here to get update news always
প্রতি মুহুর্তের আপডেট পেতে এখানে ক্লিক করন
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন